Sunday, June 28, 2020

ZOOM এর উত্থান: Microsoft এর মত জায়ান্টের সাথে পাল্লা দিয়ে যেভাবে টিকে গেলো অ্যাপটি

ZOOM wins the WFH app war. Source: bloomberg

লেনিন বলেছিলেন - "অনেক দশক যায় যেখানে কিছুই ঘটেনা, আবার এমন সপ্তাহ যায় যেখানে দশক ঘটে যায়"। কথাটি টেলিকনফারেন্সিং এপ্লিকেশন জুম (ZOOM) এর জন্য শতভাগ প্রযোজ্য। করোনাভাইরাস মহামারী অধিকাংশ কোম্পানির জন্য অভিশাপ বয়ে আনলেও, কিছু কোম্পানির জন্য হয়েছে শাপে বর। জুম তাদের মধ্যে একটি।

একটু চিন্তা করে দেখেন, করোনাভাইরাস যদি ২০১১ সালে হানা দিতো, দুনিয়াজোড়া সবাই ধুমসে স্কাইপে (Skype) ভয়েস কল এবং ভিডিও কল করতো। ২০১১র স্কাইপ-এর জায়গাটা ২০২০ এ নিয়ে নিয়েছে জুম এবং হাউজপার্টি (Houseparty)। নতুন দশকের প্রথম বছরের তিন মাস যেতে না যেতে করোনার কারণে যেখানে অফিস ডেস্ককে সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে হোম অফিস, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির ক্লাসরুম পরিণত হয়েছে ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে, পাবলিক কনফারেন্সগুলো রূপ নিয়েছে টেলিকনফারেন্স বা ওয়েবিনার-এ, সেখানে আমাদের হাতের মোবাইলটিতে বা বাসার কম্পিউটারে যোগ হয়েছে একটি অ্যাপ; জুম।

আবার যাওয়া যাক ২০১১ সালে। ঐ বছরই মাইক্রোসফট ৮.৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় স্কাইপ-কে। একই বছর আবির্ভাব হয় জুম এবং স্ন্যাপচ্যাট (Snapchat)-এর। ১০০ মিলিয়নের বেশি এক্টিভ ইউজার নিয়ে স্কাইপ-এর জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। বলাই বাহুল্য আমাদের অধিকাংশের ইন্টারনেটের মাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলের সাথে হাতখড়িই হয়েছে এই স্কাইপ-এর মাধ্যমে। স্কাইপ এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে ২০১৪-১৫ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে শব্দ হিসেবে যুক্ত করা হয় স্কাইপ-কে। এই তুমুল জনপ্রিয়তার মধ্যে মাইক্রোসফট বা স্কাইপ যে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলো সেটা অনেকেই জানতোনা বা বুঝতে পারেনাই।

প্রথম সমস্যা ছিলো যেটা সব ব্যবসাতেই থাকে, প্রতিযোগিতা; ব্যতিক্রম অবশ্য অ্যামাজন (Amazon), এটার নাম পরিবর্তন করে প্যাকম্যান (Pac-Man) রাখা যায়; It doesn't face competitions, it EATS the COMPETITIONS। যাই হউক, ঐ সময়টাতে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, স্ন্যাপচ্যাট, উইচ্যাট - এর ব্যবহার বেড়ে চলছিলো সমান তালে, যা স্কাইপ-এর জন্য ছিলো মাথাব্যথার কারণ। তবে স্কাইপ-এর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো এটি মোবাইলে ব্যবহার করতে ইউজাররা ব্যাপক ঝামেলায় পড়তো। সেই সময়টায় মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা এবং মোবাইল ইন্টারনেটের বহুল ব্যবহারের ফলে মানুষের কাছে মোবাইলের উপযোগী এপ্লিকেশনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। আর এখানেই মার খেয়ে যায় স্কাইপ।  

পরবর্তী বিজনেস স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে গিয়ে আবারো পা হড়কায় মাইক্রোসফট। স্কাইপ-কে নিজেদের উইন্ডোজ ফোনের উপযোগী করে তুলতে গিয়ে ফিচারে বেশ কিছু পরিবর্তন আনে সে। এই ট্রানসিশনের পরে স্কাইপ উইন্ডোজ ফোনের উপযোগী হলেও এন্ড্রয়েড ফোনের জন্য অতটা ইউজার ফ্রেন্ডলি ছিলোনা। তাছাড়া এই পুরো ট্রানসিশনে সময়ও অনেক বেশি নিয়ে ফেলে মাইক্রোসফট। এসময় অন্যান্য কম্পিটিটররা বেশ ভালই মার্কেট পেয়ে যায়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে মাইক্রোসফট বিভিন্ন সময়ে স্কাইপ এর লুক পরিবর্তন করে স্ন্যাপচ্যাট বা মেসেঞ্জার এর মত করার চেষ্টা করে। বলাই বাহুল্য সবগুলো স্ট্র্যাটেজি বা পরিকল্পনা হয় হিতে বিপরীত; উলটো স্কাইপ-এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিনের পর দিন কমছিলো।

স্কাইপের স্ন্যাপচ্যাট লুক। Source: idownloadblog.com


স্কাইপের মেসেঞ্জার লুক। Source: theverge.com


এর মধ্যেই মাইক্রোসফট তাদের অফিস কমিউনিকেটর লিংক (Lync)-কে পরিবর্তন করে স্কাইপের মাধ্যমে। তাদের করপোরেট ক্লায়েন্টলের কাছে বিজনেস কমিউনিকেটর হিসেবে প্রমোটও করে স্কাইপকে। কিন্তু পরবর্তীতে মাইক্রোসফট নিজেই এই প্রমোশন থেকে সরে আসে এবং তাদেরই আরেকটি প্রোডাক্ট মাইক্রোসফট টিম (Microsoft Team)-কে প্রমোট করা শুরু করে। পরবর্তীতে স্ল্যাক (Slack), ট্রেলো (Trello), ফ্যাভ্রো (Favro) ইত্যাদি বিভিন্ন বিজনেস কমিউনিকেটরের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে মাইক্রোসফট তাদের পুরো ফোকাস "Team"-এর উপর দেয় এবং স্বাভাবিকভাবেই স্কাইপের প্রমোশনের মাত্রাও স্তিমিত হয়ে পড়ে।

এখন জুম কিভাবে জনপ্রিয় হল সেটার দিকে আলোকপাত করা যাক। সহজভাবে বললে মাইক্রোসফট বা স্কাইপ যেটা করতে ব্যর্থ হয়েছিলো সেটাতেই সফল হয় জুম; এবং তা হল "ইউজার ফ্রেন্ডলিনেস"। একই রকম এপ্লিকেশন অনেকগুলো থাকার কারণে আমরা যেটা সহজে এবং হ্যাপা ছাড়া ব্যবহার করা যায় তার দিকেই ঝুঁকি। জুম বা হাউজপার্টি ব্যবহার সবচেয়ে সহজ। জুমের মাধ্যমে কথা বলতে কোন একাউন্ট থাকা লাগেনা; ৪০ মিনিট পর্যন্ত ফ্রিতে ব্যবহার করা যায়। আবার করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনের সময়ে জুম তার এই ৪০ মিনিটের সময়সীমাও তুলে দেয়। যার ফলে তার ইউজারের সংখ্যাও বাড়তে থাকে হু হু করে।

অবশ্য জুমের চলার পথ যে একেবারে মসৃণ তাও না। এইতো কিছুদিন আগে জুমবম্বিং (Zoombombing)-এর শিকার হয়েছেন কিছু ব্যবহারকারী যেখানে কিছু "বম্বার" বিভিন্ন মিটিংয়ে ঢুকে সেখানে অনাকাঙ্খিত ছবি বা ভিডিও পোস্ট করে দেয়। যদিও মনে হয়না এসব সাময়িক সমস্যা জুমের জন্য কোন বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বা দাঁড়াবে।

জুম তাদের মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কখনোই প্রকাশ করেনা; কিন্তু এটুকু জানা গিয়েছে যে, পুরো ২০১৯ সালে যেখানে তাদের ১.৯৯ মিলিয়ন ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছিলো, এই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছে ২.২২ মিলিয়ন। মাইক্রোসফট অনেক আগে থেকেই স্কাইপের ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রকাশ করা বন্ধ করে; সর্বশেষ প্রকাশিত সংখ্যা অনুযায়ী মোট ব্যবহারকারী ছিল ২০০ মিলিয়নের কিছু বেশি। ২০২০ এর মার্চের শেষ পর্যন্ত প্লে স্টোরে সর্বোচ্চ ব্যবহৃত অ্যাপের মধ্যে স্কাইপ ছিলো ৭৫ নম্বরে, টিম ৭ নম্বরে এবং জুম ছিলো ১ নম্বরে। মাইক্রোসফটও তাদের বিজনেস স্ট্র্যাটেজিতে তাদের "Team" প্রোডাক্টটিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে বেশি। ২০০ মিলিয়ন ব্যবহারকারীসহ স্কাইপকে পুরোপুরি হাওয়া করে দিলেও অবাক হওয়ার মত কিছু হবেনা (যেটি তারা করেছিল উইন্ডোজ লাইভ মেসেঞ্জারের ক্ষেত্রে)।


Zoom stock price trend. Source: Investing.com


জুমের ব্যাপারে কিছু তথ্য দিয়ে শেষ করা যাক। করোনাভাইরাস প্যান্ডেমিকের আগে (২৪ ডিসেম্বর, ২০১৯) জুমের শেয়ার মূল্য ছিল $৬৬ যা এই বছর জুনে এসে দাঁড়িয়েছে $২৫৭ তে। মার্কেট ভ্যালুর দিক দিয়ে জুম এখন ৭টা এয়ারলাইন্স কোম্পানির মার্কেট ভ্যালুর সমান। আমরা যেখানে সবাই মনেপ্রাণে চাচ্ছি করোনাভাইরাসের নিধন, জুম "অন্যরকম" কিছু চাইলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।


ZOOM Beats seven airlines combined.  Source: visualcapitalist




Reference:






Saturday, May 2, 2020

Sacred Games - সিজন ২ঃ ভারত ভাগ ও থানোস দাদুর আধা জনসংখ্যা নির্মূল নীতির ককটেল

আগের দুটি লেখার লিঙ্কঃ

যথারীতি ফাটাফাটি ছিল Sacred Games - সিজন ২। ইন্সপেক্টর সারতাজ সিং এর চরিত্রে সাইফ আলী খানের আরো পরিণত অভিনয়, গুরুজীর চরিত্রের পরিপূর্ণ বিকাশের সাথে অন্যান্য চরিত্রগুলোর জাস্টিফাইড ইম্পরট্যান্স সিরিজটির দ্বিতীয় সিজনকেও উপভোগ্য করেছে। আর গাইতোন্ডের চরিত্রে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী বরাবরের মত অসাধারণ ছিলেন। কিন্তু প্রথম সিজন যেখানে রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় উগ্রতার কুৎসিত রূপ, র-আইএসআই এর দ্বন্দ্ব, গাইতোন্ডের উত্থান, ব্যক্তিগত জীবনের মোড়, প্রেম-বিচ্ছেদ-সেক্স-ড্রাগস, সারতাজ সিং-এর ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, তার সাথে গাইতোন্ডের জুড়ে যাওয়া, চরিত্রগুলোর পৌরাণীক রেফারেন্স - সব মিলিয়ে অসাধারণ এক ককটেল ছিলো, দ্বিতীয় সিজন সেখানে কিছুটা একঘেয়ে, একমুখী। 

প্রথম সিজনের পর্বগুলোর নাম হিন্দু মিথোলজির কিছু চরিত্রের নামানুসারে দেয়া। এবারে কিছুটা বৈচিত্র্য ছিলো রেফারেন্সের দিক থেকে, সেগুলো নিয়েই এই লেখা।

পর্ব-১ মৎস্য (Matsya): মৎস্য মানে মাছের সাথে এনালজি এখানে একটু অন্যরকম। সনাতন বা হিন্দু ধর্মে ভগবানের (God) তিনটি রূপ সম্পর্কে উল্লেখ আছে - ব্রহ্মা (Brahma), বিষ্ণু (Vishnu) ও শিব (Shiva)। আর সৃষ্টির শুরু হতে এখন পর্যন্ত সময়কালকে চারটি যুগে ভাগ করা হয়েছে - সত্য (Satya), ত্রেতা (treta), দ্বাপর (Dvappar) ও কলিযুগ (Kaliyug)। একেকটি যুগের ব্যাপ্তিকাল লক্ষ বছর। Sacred Games এর এই সিজনে এই চার যুগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অনেকবার। বিশ্বাস করা হয় ভগবানের দ্বিতীয় রূপ, মানে বিষ্ণু, দশবার দশটি ভিন্ন রুপে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন বা আসবেন। এর মধ্যে প্রথম রূপ হল মৎস্য। সৃষ্টির শুরুতে নাকি এক ভয়ানক বন্যা হয় - তাতে ভগবান মৎস্যরূপে এসে প্রাণীকুলকে রক্ষা করেন। 


Source: GQ

এই পর্বসহ আরো ১/২টা পর্বে মৎস্য বা মাছের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম পর্বের শুরুতে দেখা যায় গাইতোন্ডে একটি ভাসমান জেলে বন্দী; তাকে খাবার হিসেবে শুধু মাছ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মাছ খেয়ে সে বেঁচে আছে। প্রথম পর্বটির আগানোর সাথে সাথে মাছের সাথে নামকরণের মেটাফরিকাল লিংকও পাওয়া যায়। গাইতোন্ডেকেও তার চিরচেনা শহর থেকে দূরে কেনিয়াতে নিয়ে আসা হয়। সেও নিজেকে চেনা পরিবেশের বাইরে থাকা মাছের মত আবিষ্কার করে ও বুঝতে পারে বেঁচে থাকতে হলে তাকে এখানে নতুন সাম্রাজ্য বানাতে হবে। হিন্দু মিথোলজির কোথাও কোথাও মৎস্য অবতার ও ব্রহ্মাকে এক বা অভিন্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গাইতোন্ডেও পরবর্তীতে গোচি (Gochi, একটি ড্রাগ, যা গুরুজী তার শিষ্যদের দিতেন) খেয়ে হাই হয়ে নিজেকে ব্রহ্মা মনে করা শুরু করে। এছাড়া গুরুজীও তার সভায় মাছ থেকে মানুষের বিবর্তন হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। আর বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের শরীরের ভিতরের গঠন কাঠামোর সাথে মাছের গঠন কাঠামোর মিল পাওয়া গেছে তা আমরা অনেকে জানি। মাছ এবং মানুষের বিবর্তন প্রসঙ্গে MinuteEarth এর নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন।

   Which fish did we evolve fromhttps://www.youtube.com/watch?v=W2ojuZ_s4z8

পর্ব-২ সিদুরী (Siduri): প্রাচীন মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার টিকে যাওয়া সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে 'গিলগামেশের মহাকাব্য'(The Epic of Gilgamesh) অন্যতম। অনেকের মতে এটা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো সাহিত্যকর্ম। ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গড়ে উঠা সুমেরীয় সভ্যতার এক শহরের নাম ছিল উরুক, যার রাজা ছিল গিলগামেশ। এহেন কোন খারাপ কাজ নাই, যে মামা করেনাই। সিরিয়াল রেপিস্ট হিসেবে কুখ্যাত ছিল, তার অধীনে প্রজারাও ছিল অসুখী। তার মা ছিল দেবী আর বাবা ছিল আমজনতা। সেই হিসেবে এক বা দুই তৃতীয়াংশ (do your math 😄) দেবতা ছিল গিলগামেশ। তো কিছু অংশ মানুষ থাকার কারণে সে ছিল নশ্বর, যেটা অবশ্যই তার পছন্দ হইনাই। তো মামা যখন অমরত্বের খোঁজে বের হয়, তার সাথে দেখা হয় সিদুরীর। কোন কোন ইতিহাসবিদ সিদুরীকে একজন প্রজ্ঞাশীল নারী হিসেবে উল্লেখ করেন আবার কেউ কেউ উল্লেখ করেন জ্ঞ্যান এবং বিয়ারের (Beer) দেবী হিসেবে (হ্যাঁ, দুইটা ব্যাপার কেম্নে মিলাইছে আমি জানিনা 😐)। তো এই সিদুরী গিলগামেশকে অমরত্বের পিছনে না ছুটে সহজ সরল জীবনযাপনের মাধ্যমে সুখ খুঁজে নিতে সাহায্য করে।


Hindustantimes
Source: GQ
এক্ষেত্রে কয়েকটা এনালজি দাঁড় করানো যেতে পারে। সিরিজে বাত্যা (Batya Abelman - Kalki Koechin)-কে এপিক অফ গিলগামেশ থেকে সরাসরি কোট করতে দেখা যায়। বাত্যা ছিল সারতাজ সিংয়ের (সাইফ আলী খান) স্পিরিচুয়াল গাইড, যার সাথে সিদুরীকে মেলানোও যেতে পারে। এছাড়াও গাইতোন্ডে যখন নিজের প্রভাব, ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে অবসেসড ছিল, তখন সারতাজ সিংয়ের বাবা তাকে জীবনকে সহজভাবে দেখতে বলে এবং সাধারণ জিনিসের মধ্যে সুখ খুঁজে নিতে বলে। আর এভাবেই গুরুজীর সন্ধান পায় গাইতোন্ডে। The Epic of Gilgamesh নিয়ে নিচের ভিডিওটি দেখা যেতে পারে - 

   The Epic of Gilgamesh: https://www.youtube.com/watch?v=sWppk7-Mti4

পর্ব-৩ আপাসমারা (Apasmara): হিন্দু মিথোলজি অনুসারে আপাসমারা হল অজ্ঞ্যানতা, ইগো, ঔদ্ধ্যতের দেবতা (Demon of Ignorance - opposite of Knowledge, Ego & Arrogance)। হিন্দু পুরাণগুলায় যেমন পাইকারী হারে অমরত্বের বর দেয়ার উল্লেখ আছে 😃, সেই হিসেবে আপাসমারাও সেই বর পায়। তারপর সে ভগবান শিবের (পর্ব একের বর্ণনায়) স্ত্রী পার্বতীর সব শক্তি ধ্বংস করে দেয় এবং শিবের বিরাগভাজন হয়। পরে শিব আপাস্মারার গুহায় এসে তার বিখ্যাত 'নটরাজ' রূপ ধারণ করেন এবং তান্ডব নৃত্য শুরু করেন। পরে শিব আপাস্মারাকে ডান পায়ে পিষে ফেলেন ও আপাস্মারা তার কাছে ক্ষমা চায়। 


Nataraja form of Shiva. Source: Scoopwhoop
সিরিজের তিন নং পর্বে দেখানো হয়, গাইতোন্ডে কেনিয়ায় নির্বাসিত হওয়ার পর ভারতে ফিরার জন্য  এবং নিজের আগের ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। এখানে আপাস্মারার রেফারেন্স টানার কারণ হিসেবে গাইতোন্ডের ঔদ্ধ্যত ও সে যে নিজেকে অমর বলে দাবি করে আসে - এগুলোকে বলা যেতে পারে। এরপর সে গুরুজীর শরণাপন্ন হয় এবং (সোজা বাংলায়) ঠান্ডা হয়।

পর্ব-৪ বারদো (Bardo): বৌদ্ধ ধর্মে বারদো থোদল নামের এক বইয়ের উল্লেখ আছে (Bardo Thodol - A Tibetan Book of Dead) - যেটার মূল থিম হল বারদো, যা কিনা মৃত্যু ও পুনর্জন্মের অন্তর্বতীকালীন সময়। সিরিজে গুরুজী বারবার গাইতোন্ডেকে বলে যে তাকে আগের গাইতোন্ডের মৃত্যু ঘটাতে হবে এবং মোক্ষ (চূড়ান্ত মুক্তি) প্রাপ্তির দিকে এগুতে হবে।


Death & Afterlife in Buddhism. Source: medium.com


পর্ব-৫ বিকর্ণ (Vikarna): রামায়ণ ও মহাভারত প্রাচীন ভারতে সৃষ্ট দুটি উল্লেখযোগ্য মহাকাব্য। মহাভারতে দুই বংশের বংশধরদের মধ্যকার অন্তর্কোন্দল, পরবর্তীতে তা যুদ্ধে রূপ নেয়া, যুদ্ধ শেষে রাজ্য দখল, রাজ্য বিস্তার ইত্যাদির বর্ণনা দেয়া হয় এবং একে একে সবার মৃত্যুর মাধ্যমে মহাকাব্যটি শেষ হয়। মহাভারতে যেমন প্রাচীন ভারতের যুদ্ধনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে তেমনি জীবনের সাথে মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী সময়ের যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। মহাভারতেই বর্ণিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ "শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা", সংক্ষেপে গীতা।

মহাভারতে বর্ণিত কুরু বংশের দুইটি পরিবার - কৌরব ও পান্ডব। কৌরবরা ছিল একশ রাজপুত্র ও এক রাজকন্যা এবং পান্ডবরা ছিল পাঁচভাই, যাদেরকে পঞ্চপান্ডব বলা হতো। একশ কৌরব রাজপুত্রের মধ্যে তৃতীয় ছিল বিকর্ণ, প্রথম দুজন যথাক্রমে দুর্যোধন ও দুঃশাসন। মহাভারতে কৌরবদের এন্টাগনিস্ট এবং পান্ডবদের প্রোটাগনিস্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ কৌরবদের অত্যাচারী, লম্পট, নারীলিপ্সুসহ আরো যত ধরণের ট্যাগ দেয়া সম্ভব সবই দেয়া হয়েছে। 

পঞ্চপান্ডবদের স্ত্রী, দ্রৌপদির বস্ত্রহরণ মহাভারতের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পান্ডবরা পাশা খেলায় নিজেদের স্ত্রী দ্রৌপদিকে বাজি ধরে বসে এবং হেরে যায়। সুযোগ পেয়ে কৌরবরা কূলবধূ দ্রৌপদির চরম অপমান করে তার বস্ত্রহরণের মাধ্যমে। শুধু বিকর্ণ এই অপমানের বিরোধিতা করে এবং এই নীচ কাজ করা থেকে বিরত থাকে।

সিরিজে দেখানো হয়েছে, চারদিকের চলমান অস্থিরতার মধ্যে গুরুজী সবাইকে সঠিকপথে আনার জন্য চেষ্টা করতে থাকে, আর এই ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়ে সারতাজ সিংয়ের বাবা গিলবাগ সিং গুরুজীকে বিকর্ণের সাথে তুলনা করে। এছাড়াও পরবর্তীতে সারতাজ এবং গাইতোন্ডে যখন গুরুজীর পরিকল্পনার কথা জেনে যায় তখন তারা দুজনই তার বিপক্ষে চলে যায়। তাদের এই স্ট্যান্ডপয়েন্ট ও পরবর্তী কার্যক্রমকেও দ্রৌপদির বস্ত্রহরণের সময় বিকর্ণের কার্যক্রমের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।


Dice & disrobing of Draupadi. Source: Storypick


পর্ব-৬ আজরাইল (Azrael): ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মে আজরাইলের উল্লেখ আছে মৃত্যুদ্যূত (Angel of Death) হিসেবে। ১২ জন আর্কএঞ্জেলের (Archangel) মধ্যে আজরাইল অন্যতম।আজরাইলের সাথে একটা স্ক্রল বা পার্চমেন্ট থাকে যার মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। ডিসি কমিকস এবং লুসিফারের কমিক্স ও টিভি শোতেও আজরাইলের উল্লেখ আছে বা দেখানো হয়েছে। 

   Lucifer 3x25: Lucifer Meets Azraelhttps://www.youtube.com/watch?v=pnW4iXN9Gv8

Sacred Games - এর এই পর্বে গাইতোন্ডে মুম্বাইয়ে পৌঁছায়, এবং তার সাথে থাকে গুরুজীর নিউক্লিয়ার এটাকের পরিকল্পনার "বাইবেল"। গাইতোন্ডে এখানে আজরাইলের সাথে তুলনীয় এবং তার সাথের "বাইবেল" আজরাইলের স্ক্রলের সাথে।

পর্ব-৭ টোরিনো (Torino): সিরিজের এই পর্বের নামকরণ কিছুটা কনফিউজিং। রেফারেন্স হিসেবে ইতালির তুরিন (Turin) নগরীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তুরিন ইতালির উত্তর-পশ্চিম দিকের একটি ঐতিহাসিক নগরী, আর মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে "পো" ও "ডোরা" (Po and Dora Riparia) নামক দুইটি নদী। 

তুরিন শহর।  Source: vacanzzitiva.com
সিরিজের এই পর্যায়ে এসে দেখা যায়, সারতাজ ও গাইতোন্ডে উভয়েই তাদের ব্যক্তিত্ব, তাদের মনন, চিন্তা, মানসিকতা নিয়ে চরম দ্বন্দ্বে ভুগছে। তাদের চরিত্রের ও ব্যক্তিত্বের দ্বৈততার এই দ্বন্দ্বকে দুই নদী ঘেঁষে বেড়ে উঠা তুরিন নগরীর সাথে তুলনা করা যায়। 

পর্ব-৮ র‍্যাডক্লিফ (Radcliffe): শুধু সিরিজের শেষ পর্ব হিসেবে নয়, পর্বের শেষে ক্লিফহ্যাঙ্গার এবং নামকরণের জন্যও এই পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্বটির নামকরণ কোন পৌরাণিক চরিত্র বা ধর্মীয় রেফারেন্স অনুসারে নয়, একেবারে সত্য ঘটনানুসারে করা হয়েছে।

১৯৪৭ সালে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রায় শেষের দিকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন তৎকালীন কংগ্রেসের প্রধান জহরলাল নেহেরু ও মুসলীম লীগের প্রধান মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে আলোচনা করে দেশ বিভাগের প্রস্তুতি নেন। আর সীমান্ত ভাগের দায়িত্ব দেয়া হয় এক ব্রিটিশ আইনজীবি সিরিল র‍্যাডক্লিফকে। মি. র‍্যাডক্লিফ ব্রিটেনে নামকরা আইনজীবি হলেও ভারতে কখনো কাজ করেননি; এমনকি (তার ভাষ্য মতে) ভারতের ভৌগলিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে তিনি খুব বেশি জানতেননা এবং জানতে আগ্রহীও ছিলেননা। আইন রিলেটেড কাজের বাইরেও তিনি খুব বেশি কাজ করেননি। এমন একজন আনকোরা ব্যক্তির উপর ভারত ভাগের মত বিশাল দায়িত্ব দেয়ার যুক্তি মেলানো যায়না। তার উপর তাকে সময় দেয়া হয় মাত্র ৫ দিন। ফলে নেহেরু, জিন্নাহ ও মাউন্টব্যাটেনের সাথে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে আলোচনা শেষে, ধর্মের ভিত্তিতে ভারতের মানচিত্রকে ব্যবচ্ছেদ করতে হয় র‍্যাডক্লিফকে। অবিভক্ত ভারত ভাগের জন্য দুই দেশের সীমান্তের উপর টানা এই রেখাকে  "র‍্যাডক্লিফ লাইন" (Radclliffe partition line) বলা হয়।


র‍্যাডক্লিফ লাইন।  Source: indiatoday

"র‍্যাডক্লিফ লাইন" শুধু একটা লাইন বা রেখা না; দুই দেশের এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে এটির প্রভাব আজো আছে। ধর্মের ভিত্তিতে সীমান্ত ভাগ করে র‍্যাডক্লিফ সাহেব তার দায়িত্ব শেষ করে দিলেও, এই সীমান্তরেখা যে কত লক্ষ মানুষের প্রাণহানীর, সম্ভ্রমহানীর এবং ভিটামাটি ছাড়ার ইতিহাস বহন করছে তার ইয়ত্তা নেই। পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সীমান্তে অস্থিরতা কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়ে উঠেনি। বরং কাশ্মির ইস্যু নিয়ে দুই দেশে বারবার যুদ্ধে জড়িয়েছে , যা এখনো বিদ্যমান।

সিরিজের শেষ পর্বের শুরুতেই ফ্ল্যাশব্যাকে দেশভাগের সময়কার অস্থিরতা, সংঘর্ষ ইত্যাদির দৃশ্য দেখানো হয়। কিভাবে সারতাজের পরিবার ভারতভাগের সময় আলাদা হয়ে যায় সেটাও দেখানো হয় এই ফ্ল্যাশব্যাকে।

সব মিলিয়ে প্রথম সিজনের অসাধারণ প্লটের উপর ভিত্তি করে যেখানে ভাল কিছুর আশায় ছিলো সবাই, সেখানে শেষ পর্যন্ত দেশ বিভাগের সময় থেকে মানুষের মধ্যে চেপে রাখা ক্ষোভের প্রকাশ আর থানোস দাদুর আধা জনসংখ্যা নির্মূল নীতির মিশেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে দর্শকদের। তবে শেষে রেখে যাওয়া ক্লিফহ্যাঙ্গারের জন্য আরেকটি টানটান উত্তেজনায় ভরা সিজন আশা করা যেতেই পারে। 

Friday, October 4, 2019

Battle of Streamers


মানব ইতিহাসে যুদ্ধ কম হয়নাই, এখনো হচ্ছে আর মানুষের যে খাসিয়ত, সামনেও হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ বা যুদ্ধের মত পরিস্থিতি অনেক দশক ধরে চলমান; কাশ্মীরের অস্থিরতার শেষ কবে কেউ জানে্না। বড় দেশের রাঘব-বোয়ালরা পারলে টুইটারেই যুদ্ধ ঘোষণা করে দেয়; হালের বাণিজ্য যুদ্ধ(Trade War) বা মুদ্রা যুদ্ধের(Currency War) কথা না বললেই নয়। কিন্তু আজকে এগুলার কোনটা নিয়েই লিখছিনা; লিখছি যুদ্ধের বাজারে মোটামুটি সাম্প্রতিক সংযোজন - স্ট্রিমিং যুদ্ধ (Streaming War) নিয়ে।
relates to The Streaming Video-on-Demand War Is Going to Get Bloody
প্রথমেই যুদ্ধে কারা সামিল সেটা বলি - ব্যাপার হল, কয়েক বছর আগেও স্ট্রিমিং মানেই নেটফ্লিক্স অ্যান্ড চিল ভাবতো সবাই; এখন এদের সংখ্যা আদতে কত কেউ বলতে পারেনা। ইন্টারনেট ঘেঁটে যাদের নাম পাওয়া গেছে সব লিখে দিচ্ছি -Netflix, Hulu (with Live TV), Disney+, Amazon Prime Video, Apple TV+,YouTube TV, fuboTV, Playstation Vue, HBO Now, Showtime, ESPN+, Peacock, Sling TV, AT&T TV Now (formerly DirectTV Now), Philo, CBS All Access, iflix ইত্যাদি। যেসব নাম উল্লেখ করলাম এগুলা সবই ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস। অডিও স্ট্রিমিং বা মিউজিক স্ট্রিমিং সার্ভিসের সংখ্যা বেশি না - Spotify, Amazon Prime Music, Apple Music, YouTube Premium, Gaana, Deezer, Tidal, Google Play Music - লোকজন ঘুরেফিরে প্রথম ৫-৬টার মধ্যেই ব্যবহার করে। রিভিউ পেতে চাইলে নিচের লিংকগুলো দেখতে পারেন -

 



প্রথমে স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলো কেম্নে টাকা কামায় সেটা নিয়ে একটু বলি। মোটামুটি তিন টাইপের রেভিনিউ মডেল সবাই ফলো করে। ১) ট্রাঞ্জেকশানাল ভিডিও অন ডিমান্ড (Transactional Video on Demand, TVOD) বা পে পার ভিউ (Pay per view, PPV) ২) সাবস্ক্রিপশন ভিডিও অন ডিমান্ড (Subscription Video on Demand, SVOD) ৩) এড সাপোর্টেট ভিডিও অন ডিমান্ড (Advertisement-supported Video on Demand, AVOD)TVOD-এ কিছু  পেমেন্টের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কন্টেন্ট দর্শকের জন্য উন্মুক্ত করা হয়; উদাহরণঃ itunesSVOD-ই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়; মোটামুটি সব ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস SVOD ফলো করে। মাসিক বা বাৎসরিক পেমেন্টের ভিত্তিতে কন্টেন্ট দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। AVOD এর সবচেয়ে ভালো ও জনপ্রিয় উদাহরণ YouTube, তারপর Huluবিভিন্ন প্রোডাক্ট প্রচারের এডের মাধ্যমে Netflix, Amazon Prime এরাও আয় করে; কিন্তু সেটা তাদের মোট আয়ের খুব কম অংশ। কারণ Netflix, Amazon Prime এর মত অধিকাংশ ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস কন্টেন্ট স্ট্রিমিংয়ের সময় এড দেখায়না; ফ্রি কন্টেন্ট স্ট্রিমিংয়ের সময়, বা ওয়েবসাইটের চিপা দিয়ে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেখিয়ে দেয়। স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোও নতুন কোন টিভি সিরিজ বা মুভি বা তাদের অরিজিনাল কন্টেন্ট অন্তর্ভুক্ত করলে দর্শকদের জানানোর জন্য এড দেখায়, কিন্তু সেটাতে তাদের খরচও হয়। কিছু স্ট্রিমিং সার্ভিস এডসহ কন্টেন্ট ফ্রি স্ট্রিমিংয়ের সুযোগ দেয়, কিন্তু এড ফ্রি স্ট্রিমিং ও ডাউনলোডের জন্য সাবস্ক্রিপশন ফি চার্জ করে - যেমনঃ Gaana, Comcastশুধু নেটফ্লিক্স কিভাবে আয় করে তা জানতে চাইলে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন।
১. How does Netflix work and make money - https://www.youtube.com/watch?v=xkIdAA7zto4

নিচে প্রতি ডলার আয় করতে অডিও স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোর কতগুলো স্ট্রিমিংয়ের দরকার হয় এবং শিল্পীরা কিভাবে আয় করে তা দেয়া হলঃ

Streaming service
Avg. payout per stream
No. of streams to earn one dollar
No. of streams to earn minimum wage*
Napster
$0.019
           53
                  77,474
Tidal
$0.0125
           80
                 117,760
Apple Music
$0.00735
          136
                 200,272
Google Play Music
$0.00676 
          147 
                 217,751
Deezer
$0.0064
          156
                 230,000
Spotify
$0.00437
          229
                 336,842
Amazon
$0.00402
          249
                 366,169
Pandora**
$0.00133  
          752
               1,106,767
YouTube
$0.00069
        1,449
               2,133,333


যদিও "স্ট্রিমিং যুদ্ধ (Streaming War)" শব্দদুটো মিডিয়াতে এসেছে ভিডিও সার্ভিসগুলোর হাত ধরে, এই যুদ্ধ শুরু করেছিলো অডিও সার্ভিসগুলো। ২০১৫ সালের মে মাসে Spotify তাদের প্ল্যাটফর্মে ভিডিও স্ট্রিমিং, পডকাস্ট (Podcast), পুরোনো এবং তখনকার বিখ্যাত কিছু পপ গান, জিঙ্গেল ইত্যাদি সংযুক্ত করে। এছাড়াও টিন্ডার (Tinder) এর মত swipe-এর মাধ্যমে গান পছন্দ করা ইত্যাদি ফিচার যোগ করে। ঐ সময়ের কিছু আগে থেকে Spotify এর বিরুদ্ধে গানের স্ট্রিমিং-প্রতি শিল্পীদের কম পারিশ্রমিক দেয়ার অভিযোগ উঠেছিলো। অভিযোগকারীদের মধ্যে গায়ক থমাস ইয়র্কও (ব্যান্ডঃ Radiohead) ছিলেন, যিনি অডিও স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোকে বলেছিলেন "the last desperate fart of a dying corpse"যদিও তিনি শুধু Spotify কে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলেননি, কিন্তু পারিশ্রমিক সংক্রান্ত ঝামেলার সময়েই কথাটা বলেন। সুযোগ বুঝে Apple Music তাদের অডিওর পে-পার-স্ট্রিমিং রেট (pay per streaming rate) বাড়িয়ে দিয়ে Radiohead-এর ও থমাস ইয়র্কের কিছু সলো গান নিয়ে আসে। এভাবেই যুদ্ধের শুরু।

২০১৮ এর শেষের সময় থেকে যখন Disney Fox এর এক হয়ে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো কিংবা Netflix এর বাতিল করা একের পর এক টিভি-সিরিজগুলো যখন অন্যরা অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দিচ্ছিলো তখনি বুঝা যাচ্ছিলো, ২০১৯ এবং তার পরে সি এন্ড পি (Content & Price) যুদ্ধে নামতে যাচ্ছে স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলো। এই বছরের মার্চের দিকে Disney-Fox এক হওয়ার পর Disneyর কন্টেন্টের প্রতি অন্যরা ঈর্ষা করতেই পারে। ফক্স টিভি নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ কন্টেন্ট লাইব্রেরী এখন Disneyর কাছে। মার্ভেলের মুভিগুলোর সাথে Netflix-এর বাতিল করা মার্ভেলের টিভি সিরিজগুলোHow i met your motherGrey's Anatomy এর সাথে Titanic মিশিয়ে দর্শকদের সময়গুলো খারাপ কাটবেনা। সাথে আরেক স্ট্রিমিং সার্ভিস Huluর ৬০% মালিকানা (Disneyর নিজের ৩০% + Foxর ৩০%) অর্জনতো আছেই।

Disney+ streaming platform
Disneyর মূল প্রতিযোগিতা Netflix এর সাথে হলেও তার সাথে টক্কর দিতে প্রস্তুত হচ্ছে Apple TV+স্প্রিন্টের শুরুটা অবশ্য সন্তোষজনক না Apple এর জন্য; Disneyর কন্টেন্ট লাইব্রেরীর ধারেকাছেও নাই সে। আপাতত স্ট্রিমিং সার্ভিসটি ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক কন্টেন্ট ডেভেলপমেন্টে না গিয়ে জনপ্রিয় তারকাদের (অপরা উইনফ্রে, জেনিফার অ্যানিস্টন প্রমুখ) অভিনীত মুভি, টিভি-সিরিজ ও শোগুলো দর্শকদের দেখানোর মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চাচ্ছে। তার লক্ষ্য কন্টেন্ট দিয়ে ফাইট না করে কম সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে দর্শক টানা। সেজন্য মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি Disneyর চেয়ে ২ ডলার কম চার্জ করবে (সবচে কম চার্জ তার, ৪.৯৯ ডলার); এছাড়াও নতুন আইফোন ক্রেতাদের জন্য ১ বছরের ফ্রি স্ট্রিমিংয়ের সুবিধাও দিচ্ছে সে। দেখার বিষয় ২য় বছর থেকে কয়জন সাবস্ক্রিপশন রিনিউ করে। অন্যদিকে Disney+র মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি ৬.৯৯ ডলার, বছরে ৬৯.৯৯ ডলার; যা কিনা Netflix HBO Now এর প্রায় অর্ধেক। সেই সাথে প্যাকেজ সার্ভিসের সুবিধা দিচ্ছে সে; Disney+, ESPN+ Hulu একসাথে পাওয়া যাবে প্রতি মাসে ১৪ ডলার ফির মাধ্যমে। সাথে Netflix এর সাথে টক্কর দেয়ার মত কন্টেন্টতো আছেই। Disney Fox এর মোটামুটি সব মুভি, মার্ভেলের মুভি ও সিরিজ, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ২৫টি অরিজিনাল সিরিজStar Wars এর মত বিখ্যাত ফ্র্যাঞ্চাইজির সাথে থাকছে The Simpsonsইতিমধ্যেই মার্ভেলের কারেক্টারগুলো নিয়ে আলাদা আলাদা টিভি সিরিজ নির্মাণের ঘোষণা এসেছে (LokiWandaVision) Star Wars মুভি প্রদর্শনের পাশাপাশি এই ফ্র্যাঞ্চাইজির টিভি সিরিজ The Mandalorian নির্মাণে ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে Disney+May the force be always with it 😛😛নতুন নতুন মা-বাবা হচ্ছে যারা তাদের বাচ্চা সামলানোর জন্য Disneyর এনিম্যাশন মুভির কোন বিকল্প নাই। আর আমরা যারা নাইন্টিস কিডস, তারাও মুভিগুলো দেখে একটু নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হতে চাইবো বৈকি। 

ফার্স্ট মুভার এডভানটেজের (First mover advantage) কারণে প্রায় ১৬ কোটি সাবস্ক্রাইবার নিয়ে Netflix অন্য যেকোন স্ট্রিমিং সার্ভিসের চেয়ে এগিয়ে আছে এবং সামনেও থাকবে। পুরোনো কন্টেন্ট দেখানো ও অরিজিনাল কন্টেন্ট নির্মাণের পাশাপাশি এশিয়া, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকাতে ব্যবসা বাড়াচ্ছে স্ট্রিমিং সার্ভিসটি। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হওয়া, খুব কম সময়ের মধ্যে কিছু জনপ্রিয় সিরিজ বাতিল করাসহ বিবিধ কারণে এই বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাবস্ক্রাইবার হারিয়েছে কোম্পানিটি। তাছাড়া যেহেতু Netflix এড ফ্রি স্ট্রিমিংয়ের সুবিধা দেয়, পণ্য প্রচারকারী কোম্পানিগুলো অন্য স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোর মাধ্যমে তাদের পণ্য প্রচার করে। তাই বিজ্ঞাপণ থেকে Netflix এর আয় খুবই কম। সেই সাথে কন্টেন্ট নিমার্ণ সহ মার্কেটিং ইত্যাদিতে ব্যয়ের জন্য ৪ বিলিয়ন ডলার লোন নিয়েছে কোম্পানিটি। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির আয়ে, নিট লাভের পরিমাণে ও শেয়ার মূল্যে। তাছাড়া সামনে মার্কেট শেয়ার ধরে রাখতে হলে সাবস্ক্রিপশন ফিও কমাতে হতে পারে। সুতরাং সামনের কয়েক বছরে স্ট্রিমিং সার্ভিসটির সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা অন্যদের চেয়ে বেশি থাকলেও কোম্পানিটি কতটুকু লাভজনক থাকবে সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। UK ভিত্তিক মিডিয়া এনালাইসিস কোম্পানি ডিজিটাল টিভি রিসার্চ তাদের একটি রিপোর্টে ২০২৪ সালে স্ট্রিমিং সার্ভিস কোম্পানিগুলোর সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা কেমন হতে পারে তা উল্লেখ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে অন্যদের চেয়ে Netflix এর সাবস্ক্রাইবার বেশি থাকলেও সাবস্ক্রাইবার হারানোর হারও(Churn rate) বেশি থাকবে কোম্পানিটির। 
 
Netflix Disneyর শেয়ার মূল্য। Source: CNBC
Digital TV research on Streaming Landscape in five years
কথায় আছে, "রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে, উলখাগড়ার প্রাণান্ত"। এখানেও একই অবস্থা; দিশেহারা সাবস্ক্রাইবাররা। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবে; কোনটায় সাবস্ক্রাইব করবে বুঝে উঠতে উঠতে নতুন কন্টেন্ট নিয়ে হাজির স্ট্রিমাররা। জেনিফার অ্যানিস্টন, রিজ উইদারস্পুনের The Morning Show দিয়ে দর্শক আটকাবে Apple TV+; ঐদিকে Cartoon Network, The Big Bang Theory, Friends দিয়ে সব বয়সের দর্শক হাসাবে HBO Max; The Handmaid's Tale, মার্ভেলের সিরিজ Ghost Rider  Helstrom নিয়ে হাজির Hulu; Friends বাতিল করে Seinfield দেখানোর জন্য প্রস্তুত Netflix; Brooklyn Nine-Nine, Fast & Furious, Back to the Future বা Saturday Night Live দেখতে হলে টিউন করতে হবে Peacock Jack Ryan, The Big Sick বা Lord of the Rings এর সিরিজ নিয়ে ছাড় দিতে রাজি নয় Amazon Prime ও। Netflix এর কন্টেন্ট কম বেশি সবারই চোখে পড়ে; আর Disney+ এর কন্টেন্ট উপরে উল্লেখ করেছি। তাছাড়া  YouTube এবং Facebook Watch ও অপেক্ষা করছে বড় পরিসরে নামার জন্য। সব মিলিয়ে দেখেন কার কার সাথে থাকবেন 😜😜
আমার বাজি Disneyর পক্ষে। বাই দ্য ওয়ে, ১২ই নভেম্বর থেকে Disney+ তাদের অফিসিয়াল স্ট্রিমিং শুরু করবে। দর্শকদের জন্য প্রি-সাবস্ক্রিপশনের সুবিধা দিয়েছে সে। আর আমাদের মানে বাংলাদেশিদের জন্য এখনো উন্মুক্ত হয়নি, শীঘ্রই হবে হয়ত।