Sunday, September 13, 2020

What Happened to Doel?

"দোয়েল" (Doel) ল্যাপটপের কথা কি মনে আছে? এটি ছিলো বাংলাদেশে এসেম্বল করা প্রথম ল্যাপটপ। টেলিফোন শিল্প সংস্থা (TSS) ২০১১ জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের অধীনে একটি প্রজেক্টের আওতায় ঐ বছরের অক্টোবর মাসে বাজারে আনে দোয়েল ল্যাপটপ। অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের ৪টি ভিন্ন মডেলের ল্যাপটপ সেই সময় বাজারে এনেছিল সংস্থাটি। ল্যাপটপটির সর্বনিম্ন মূল্য ছিলো ১০,০০০ টাকা বা ১৩০ ডলার বা ৮৩ পাউন্ড; বাকি মডেলগুলোর মূল্য ছিল যথাক্রমে ১৩৫০০, ২২০০০ ও ২৬০০০ টাকা। 

সেই সময়টায় মানে ২০১০-১১ সালের দিকে এশিয়ার দেশগুলো ইলেক্ট্রনিক্স মার্কেটে নিজেদের বানানো পণ্য আনার ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠেছিলো। ইন্টেলের প্রসেসরের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে চীন কম্পিউটার প্রসেসর বানানোর উদ্যোগ নেয়। ভারতও নিজেদের তৈরি ট্যাবলেট মার্কেটে আনার চেষ্টা করেছিলো। বাংলাদেশও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কম দামের ল্যাপটপ দেয়ার লক্ষ্যে লোকালি এসেম্বলকৃত ল্যাপটপ বাজারে আনে। TSS, ঢাকাভিত্তিক 2M Corporation এবং মালয়েশিয়ান Thin Film Transistor (TFT) Technology সম্মিলিতভাবে এই প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিলো। শুরুতে মাত্র ১০% পার্টস বাংলাদেশে তৈরি হলেও ধীরে ধীরে ৬০% পার্টস বাংলাদেশে প্রস্তুত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো।

সবচেয়ে কম মূল্যের মডেলটির নাম ছিল Doel 2102; 800MHz VIA 8650 প্রসেসর; 512MB র‍্যাম; 10.1" 1024x600 ডিসপ্লে, 16GB ফ্ল্যাশ মেমোরি। ল্যাপটপটির ইন্টারনাল স্টোরেজ ছিলোনা, কিন্তু একটি এসডি কার্ডের স্লট ছিল। পরের মডেলটি অর্থাৎ ১৩,৫০০ টাকা দামের মডেলটির নাম ছিলো Doel 0703, যার স্পেসিফিকেশন কিছুটা বেটার ছিলো; বেটার স্ক্রিন, Atom N456 প্রসেসর, 1024MB র‍্যাম, 250GB হার্ডডিস্ক এবং তুলনামূলক বেটার ওয়েবক্যাম। এছাড়াও অপারেটিং সিস্টেম ছিলো লিনাক্স, আবার অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম এডজাস্ট করার সুবিধাও ছিলো।

পতনের কারণসমূহ

২০১১ সালের বাজারে আনার পর ২ বছর যেতে না যেতেই প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যায় 'দোয়েল' এর।  বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে প্রজেক্টের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়াকে দায়ী করা হয়। কনফিগারেশন ভাল না হওয়ার কারণে এই ল্যাপটপের চাহিদাও ছিল অনেক কম। ২০১৩ সালে প্রকাশিত TSS এর বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই বছরে মাত্র ২৮,৬২২টি ল্যাপটপ বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে TSS। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়-ই নেয় দুই-তৃতীয়াংশ বা ১৭,৮১৫টি। 

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে এই প্রজেক্টের অন্য দুই পার্টনার, 2M Corp ও TFT -এর কাছ থেকে। দোয়েল ল্যাপটপ বাজারে আনার এক বছর যেতে না যেতে তারা এই প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ায়। এই প্রজেক্ট ভেঞ্চারের ৭৫% মালিকানা ছিলো তাদের কাছে। যার দরুন এই প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় TSS-কে, ফলশ্রুতিতে এসেম্বল করা ল্যাপটপের উল্লেখযোগ্য অংশ অবিক্রীত থেকে যায়। ২০১৩ সালের TSS এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুই বছরে ২৮,০০০ ল্যাপটপ বিক্রির বিপরীতে ৪২,১৯৫টি ল্যাপটপ এসেম্বল করার জন্য পার্টস কিনা হয়, তার মধ্যে এসেম্বল করা হয় ৩৭,০৫৯টি।

Source: Dhaka Tribune

দাম কম রাখতে গিয়ে দোয়েল ল্যাপটপের মানের দিক থেকে কম্প্রোমাইজ করা হয়েছে বলে মনে করেন কনজিউমাররা। ল্যাপটপটির বেশিরভাগ পার্টস-ই টেকসই ছিলোনা; পারফর্মেন্সও বেশ খারাপ পাচ্ছিলো ব্যবহারকারীরা। তাছাড়া ল্যাপটপটির জন্য কোন বিক্রয়-পরবর্তী সেবাও দেয়া হতনা। এসমস্ত বিষয় ল্যাপটপটির কম চাহিদার কারণ বলে মনে করেন অনেকে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ৫০ জন দোয়েল ল্যাপটপ ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা হয়। এতে দেখা যায় কিছু পার্টস ছাড়া দোয়েল ল্যাপটপের প্রায় সব পার্টসেই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন ব্যবহারকারীরা। ল্যাপটপের ব্যাটারীর ব্যাপারে ৮৩% ব্যবহারকারীর অভিযোগ ছিলো, র‍্যামের ব্যাপারে ৩৫% এবং প্রসেসরের ব্যাপারে অভিযোগ ছিলো প্রায় ১৮% ব্যবহারকারীর।

                                                      Problem faced by DOEL laptop user                                           Source: Hoque, Fauji & Balo;  Enactment of a Local Laptop Brand: A Study on DOEL Laptop

অবশেষে TSS ২০১৬ সালে দোয়েল ল্যাপটপের প্রজেক্ট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয় TSS। TSS এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৬-১৭ তে উল্লেখ করা হয়, ২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মোট ১১টি মডেলের ৬৩,২৪৫টি দোয়েল ল্যাপটপ এসেম্বল করা হয় এবং ৫৮,৭৫০টি বিক্রী হয়। 

২০১৯ সালের শেষ দিকে নতুনভাবে দোয়েল ল্যাপটপের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেয় TSS। নতুন ল্যাপটপগুলির কয়েকটিতে দাম কিছুটা বেশি রেখে ভাল কনফিগারেশনের দিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলে TSS।  এছাড়াও দেশব্যাপী দোয়েল ল্যাপটপের ২০টি শো-রুম এবং সার্ভিস সেন্টার খোলার কথা বলা হয়। এই কার্যক্রমের আওতায় Doel Advanced 1612-i5 নামের একটি ল্যাপটপ বাজারে আনার কথা আছে যার মূল্য ৪২,০০০ টাকা।

Source: www.doel.com.bd


প্রায়োরিটি বেসিসে সরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বসাধারণের কাছে কম মূল্যে ভাল দামের ল্যাপটপ সরবরাহ করতে পারলে এবং বিক্রয়-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করতে পারলে দোয়েল ল্যাপটপ ইলেকট্রনিক্স মার্কেটে ভাল অবস্থান নিতে পারবে ।
 
 
Reference:
 
 
 
 




Monday, September 7, 2020

Jio Investment Mania - কেন বিশ্বের টেক জায়ান্টগুলো ইনভেস্ট করছে Jio তে

করোনা ভাইরাসের প্রকোপে ক্ষুদ্র ও মাঝারী আকারের ব্যবসায়ীদের যেখানে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, সেখানে টেলিকম ও ই-কমার্সসহ কনজাম্পশন-বেইজড প্রোডাক্ট সরবরাহকারী বড় বড় কোম্পানীর মালিকরা বহুগুণে তাদের ব্যবসা বাড়িয়ে নিয়েছেন। Reliance Industries Ltd. (RIL) এর মালিক মিঃ মুকেশ আম্বানী তাদের মধ্যেই একজন। এই করোনাকালে তিনি এসে গিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ধনীর এলিট লিস্টে। গত ২২শে এপ্রিল থেকে শুরু করে ১৫ই জুলাই রিলায়েন্সের এজিএম পর্যন্ত সর্বমোট ১৩টি কোম্পানি রিলায়েন্সের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, Jio Platforms Ltd. (JPL) - এ ইনভেস্ট করার ঘোষণা দিয়েছে। এজিএমের বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে সপ্তাহ প্রতি ১টির বেশি ডিল পকেটে পুরেছেন মিঃ আম্বানী। কেন হঠাৎ করে বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো ইনভেস্ট করছে Jio Platforms এ? এইসব নিয়েই আলোচনা করবো আজকের লেখায়।

History of Jio Platforms Ltd. (JPL)

Jio Platforms Ltd. হচ্ছে রিলায়েন্সের ডিজিটাল বিজনেস সাবসিডিয়ারি। ২০১৯ এর অক্টোবরে রিলায়েন্স তাদের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের অংশ হিসেবে Jio Platforms প্রতিষ্ঠা করে। বিভিন্ন কারণে রিলায়েন্সের টেলিকম সাবসিডিয়ারি Reliance Jio আলোচনায় থাকলেও অন্যান্য ডিজিটাল বিজনেসগুলো বেশ আড়ালেই ছিল। অবশেষে গতবছর রিলায়েন্স, তার টেলিকম বিজনেস ও অন্যান্য ডিজিটাল বিজনেসগুলো একই প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করে আলাদা ডিজিটাল বিজনেস সাবসিডিয়ারি বানিয়ে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

Companies under Jio Platforms

Source: RIL Annual Report FY2020

  1. Reliance Jio Infocomm Ltd. ছোটভাই অনিল আম্বানির সাথে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কলহের সূত্রে প্রতিষ্ঠিত নন-কম্পিট এগ্রিমেন্টের কারণে মুকেশ আম্বানির এনার্জি ও টেলিকমসহ আরো কিছু ব্যবসায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। আবার অনিল আম্বানির এনার্জি ও টেলিকম ব্যবসার অবস্থা ছিলো নাজুক। সুযোগটা হারাতে চাননি মুকেশ আম্বানি। ২০১০ সালে ভারতে Broadband Wireless Access (BWA) এর ফোরজি লাইসেন্সের নিলামের কিছুদিন আগে ছোটভাইয়ের ডুবতে বসা এনার্জি বিজনেস বাঁচাতে এগিয়ে আসেন তিনি। বিনিময়ে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত নন-কম্পিট এগ্রিমেন্টটি রদ করান তিনি। যার ফলে টেলিকম ব্যবসায় প্রবেশের আর কোন বাধা ছিলোনা তার। ফোরজি লাইসেন্সের নিলামে Infotel Broadband Services Ltd. (IBSL) নামের এক অখ্যাত ব্রডব্যান্ড কোম্পানি ১২,৮৪৮ কোটি রুপি বা ২.৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে স্পেক্ট্রাম কিনে নেয়। নিলাম শেষ হওয়ার ঘন্টাখানেক পরে কোম্পানিটির ৯৫% শেয়ার কিনে নেন মুকেশ আম্বানি। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের জানুয়ারীতে Infotel Broadband এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Reliance Jio Infocomm Ltd. বা Reliance Jio (RJio)। পরে ২০১৫ সালে স্বল্প আকারে এবং ২০১৬ সালে পুরোদমে রিলায়েন্সের টেলিকম সাবসিডিয়ারি হিসাবে ব্যবসা শুরু করে Jio।
  2. MyJio হচ্ছে Jio'র সুপার অ্যাপ, অর্থাৎ গ্রাহক অনেকগুলো সার্ভিস একসাথে এই অ্যাপে পায়। বেসিক টেলিকম সার্ভিস যেমন ভয়েস ও ডাটা প্ল্যান ঠিক করা, রিচার্জ করা, বিল পেমেন্ট তো আছেই, এসবের সাথে গান শুনা, মুভি, টিভি শো দেখা এসব সুবিধাও পাওয়া যায় এই সুপার অ্যাপে। ২০১৬ সালে প্লে স্টোরে এসে মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডাউনলোড অতিক্রম করে MyJio অ্যাপ। এই বছরের শুরুতে, জানুয়ারির ১৪ তারিখে, MyJio অ্যাপে 'Jio Mini Apps" নামে একটি ফিচার আনা হয় যেখানে Jio Platforms এর আরো কিছু সার্ভিস যেমন - JioCloud (Cloud Service), JioTV (Streaming Service), JioCinema এবং JioEngage (Game Playing Platform), ইত্যাদি সংযুক্ত করা হয়। একই দিনে MyJio অ্যাপে UPI payment চালু করার মাধ্যমে ভারতে প্রথম টেলিকম অপারেটর হিসেবে এই পেমেন্ট সার্ভিস দেয়া শুরু করে Jio। UPI বা Unified Payment Interface এর মাধ্যমে মোবাইল প্ল্যাটফর্মে তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টার-ব্যাঙ্ক ট্রান্সেকশন করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল, UPI payment provider হিসেবে ট্রাকশন পেতে Google Pay, Paytm, Phone Pe, ইত্যাদি টপ প্লেয়ারদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে Jio কে।
  3. JioTV এবং JioTV+ এর মাধ্যমে স্ট্রিমিং সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছে রিলায়েন্স। JioTV-এর মাধ্যমে Jio-র কাস্টমাররা বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও প্রোগ্রামসমূহ স্মার্ট ফোন ও ট্যাবলেটে দেখতে পারে।
  4. JioNews হচ্ছে নিউজ চ্যানেল, ৮০০টিরও বেশি ম্যাগাজিন ও ৩০০টির বেশি নিউজপেপার সম্বলিত Jio Platforms এর একটি  অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন।
  5. JioCloud হচ্ছে ক্লাউড স্টোরেজ, ডাটা ব্যাকআপ এবং ফাইল ট্রান্সফার সার্ভিস সম্বলিত Jio Platforms এর অ্যাপ্লিকেশন।
  6. JioCall দিয়ে টুজি, ত্রি-জি এবং ফোরজি-এলটিই সাপোর্টেড স্মার্টফোনে ফোরজি-এইচডি ভয়েস কল এবং ভিডিও কল করা যায়। এছাড়াও Rich Communication Services (RCS) সুবিধার মাধ্যমে কলের মধ্যে থাকা অবস্থায় লোকেশন শেয়ারিং, ডুডল এড করা, গ্রুপ চ্যাট করা, ইত্যাদিও করা যায়।
  7. JioChat এর মাধ্যমে ডাটা কলিং, ভিডিও কলিং ও চ্যাটিং ফ্যাসিলিটি দিয়ে আসছে Jio। এছাড়াও JioMeet এর মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সিং ও ওয়েব কনফারেন্সিং সার্ভিস দিচ্ছে Jio।
  8. এসব ছাড়াও JioHealthHub (হেলথকেয়ার সার্ভিস অ্যাপ), JioSecurity (মোবাইল সিকিউরিটি সার্ভিস), JioSwitch (ফাইল ট্রান্সফার ও শেয়ারিং অ্যাপ), JioBrowser, ইত্যাদি বিভিন্ন সার্ভিস প্রদানের মাধ্যমে স্ট্রং ব্র্যান্ড পজিশনিং করতে সক্ষম হয়েছে Jio।
  9. JioMoney হচ্ছে Jio-র ডিজিটাল ওয়ালেট যা দিয়ে ফোনে অর্থ জমা রাখা এবং তা দিয়ে পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে পেমেন্ট করার সুবিধা পাওয়া যায়।
  10. JioMart এর মাধ্যমে এই বছর ই-কমার্স বিজনেসে প্রবেশ করলো রিলায়েন্স। ক্ষুদ্র ও মাঝারী ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা এই শপিং পোর্টালের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে WhatsApp Business App এ সংযুক্ত থেকে অর্ডার গ্রহণ করবে ও পণ্য বিক্রয় করবে। আর ক্রেতারা WhatsApp-এর মাধ্যমে পণ্য অর্ডার দিতে পারবে। আরেক ই-কমার্স জায়ান্ট Amazon ইতোমধ্যে JioMart এ বিনিয়োগের ইংগিত দিয়েছে।
  11. উল্লেখযোগ্য Merger & Acquisitions:
    • JioSaavn (Jio-Saavn): অনলাইন মিউজিক স্ট্রিমিং সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম
    • Jio-Embibe: ডিজিটাল এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম
    • Jio-Radisys: 5G ও IoT-ভিত্তিক সার্ভিসের জন্য সফটওয়্যার সলিউশন্স কোম্পানি

Timeline of Jio Investment Mania
  • ২২শে এপ্রিল সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট Facebook, Jio Platforms এ ৪৩,৫৭৪ কোটি রুপি বা ৫.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়, যা প্ল্যাটফর্মটির ১০% শেয়ারের সমতুল্য। এটি ভারতের টেক সেক্টরে সবচেয়ে বড় Foreign Direct Investment (FDI)।
  • ২রা মে টেক সেক্টরে বিনিয়োগকারী ফার্ম Silver Lake Partner্‌ Jio Platforms এর ১.২% শেয়ার কিনে নেয়ার মাধ্যমে ৫,৬৫৬ কোটি রুপি বা ০.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
  • ৮ই মে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম Vista Equity Partners, Jio Platforms এর ২.৩% শেয়ার কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয়, যার মূল্য ১১,৩৬৭ কোটি রুপি বা ১.৫ বিলিয়ন ডলার।
  • ১৭ই মে General Atlantic, Jio Platforms এর ১.৩% শেয়ার কিনে নেয়ার মাধ্যমে ৬,৫৯৮ কোটি রুপি বা ০.৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
  • ২২ই মে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেক প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম KKR & Co., Jio Platforms এর ২.৩% শেয়ার কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয়, যার মূল্য ১১,৩৬৭ কোটি রুপি বা ১.৫ বিলিয়ন ডলার।
  • ৫ই জুন, আবুধাবীভিত্তিক সভরেইন ইনভেস্টর Mubadala Investment Company, Jio Platforms এ ৯,০৯৪ কোটি রুপি বা ১.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়, যা প্ল্যাটফর্মটির ১.৯% শেয়ারের সমতুল্য। একই দিনে Silver Lake Partner্‌s আরো ৪,৫৪৭ কোটি রুপি বিনিয়োগের মাধ্যমে ০.৯% শেয়ার কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয়।
  • ৭ই জুন Abu Dhabi Investment Authority (ADIA), Jio Platforms এর ১.২% শেয়ার কিনে নেয়ার মাধ্যমে ৫,৬৮৪ কোটি রুপি বা ০.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
  • ১৩ই জুন অল্টারনেটিভ অ্যাসেট কোম্পানি TPG, Jio Platforms এ ৪,৫৪৬ কোটি রুপি বা ০.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়, যা প্ল্যাটফর্মটির ০.৯% শেয়ারের সমতুল্য। একই দিনে কনজিউমার-কোম্পানি ফোকাসড প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম L Catterton ১,৮৯৫ কোটি রুপি বিনিয়োগের মাধ্যমে ০.৪% শেয়ার কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয়।
  • ১৮ই জুন সৌদি আরবের একটি পাব্লিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, Jio Platforms এর ২.৩% শেয়ার কিনে নেয়ার মাধ্যমে ১১,৩৬৭ কোটি রুপি বা ১.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
  • ৩ই জুলাই বিশ্ববিখ্যাত সিপিউ মেকার Intel এর ইনভেস্টমেন্ট সাবসিডিয়ারি, Intel Capital, Jio Platforms এ ১,৮৯৫ কোটি বা ০.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটির ০.৪% শেয়ার কেনার ঘোষণা দেয়।
  • ১২ই জুলাই বিশ্ববিখ্যাত চিপমেকার Qualcomm এর ইনভেস্টমেন্ট সাবসিডিয়ারি, Qualcomm Ventures, Jio Platforms এ ৭৩০ কোটি বা ০.১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটির ০.২% শেয়ার কেনার ঘোষণা দেয়।
  • সবশেষে ১৫ই জুলাই, রিলায়েন্সের এজিএমের দিনে, বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি গুগল, Jio Platforms এর ৭.৭% শেয়ার কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয়, যার মূল্য ৩৩,৭৩৭ কোটি রুপি বা ৪.৪ বিলিয়ন ডলার, যা এই ১৪টি ইনভেস্টমেন্ট ডিলের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই ঘোষণার একদিন আগে গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি Alphabet এর সিইও মিঃ সুন্দর পিচাই ভারতে আগামী ৫-৭ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। 
সর্বমোট ৮টি প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম ৭.৯ ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিলো Jio Platforms এ, যা যথাক্রমে ফেসবুক ও গুগলের বিনিয়োগের ৪০% ও ৮০%  বেশি।

Source: NDTV

Products & Services from the Investments
  • Jio-Facebook: গত বছরের ডিসেম্বরে Jio তাদের অনলাইন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম JioMart এর কার্যক্রম সীমিত আকারে শুরু করে। আর Facebook এর পক্ষ থেকে বিনিয়োগের ঘোষণা আসার দিন দুয়েক পরে অনলাইনে আত্নপ্রকাশ করে JioMart। Jio-তে Facebook এর ইনভেস্টমেন্ট ভারতের ই-কমার্স ব্যবসায় সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টটির অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিলো। FlipKart ভারতীয় ই-কমার্স সেক্টরের ৬০% শেয়ার দখলে রাখলেও Walmart এর মালিকানা থাকার কারণে রেগুলেটরি বিধিনিষেধের মুখে পড়েছে। এক্ষেত্রে দেশী কোম্পানি হওয়ার সুবাদে Jio সরকারী আনুগত্যের কারণে তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ পাবে। 
  • Jio-Google: ভারতের বিপুল পরিমাণ গরীব জনগোষ্ঠীর কাছে স্বল্প দামের স্মার্টফোন পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে Jio তে বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেয় Google। এর আগে কোম্পানিটি "Google For India" নামের একটি Digitization Fund এর মাধ্যমে ভারতে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। Jio তে বিনিয়োগের অপেক্ষায় থাকা ৪.৫ বিলিয়ন ডলার সেই ফান্ডেরই একটা অংশ। Jio-এর প্রায় ৪০ কোটি টেলিকম সার্ভিস সাবস্ক্রাইবারদের কাছে এফোর্ডেবল স্মার্টফোন পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে দ্রুত স্মার্টফোনের বাজার দখল করাই গুগলের লক্ষ্য।
  • Jio-Silver Lake: US-ভিত্তিক প্রাইভেট ইক্যুইটি কোম্পানি Silver Lake টেকনোলজি সেক্টরে বিনিয়োগের জন্য বিখ্যাত। সর্বশেষ আপডেটেড তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির Asset Under Management (AUM) প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। Twitter, Alibaba, Ant Financial, Dell সহ আরো কিছু লিডিং টেক কোম্পানিতে ইনভেস্ট করেছে Silver Lake। এসব ইনভেস্টমেন্ট থেকে বছরে ২০৪ বিলিয়ন ডলারের মত আয় হয় Silver Lake এর। ২০০৯ সালে ebay এর কাছ থেকে ১.৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে Skype-কে কিনে ২০১১ সালে Microsoft এর কাছে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করার মাধ্যমে প্রাইভেট ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্টের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল exit deal সম্পন্ন করার রেকর্ড নিজের কাছে রেখেছে Silver Lake। ২০১৩ সালে ভারতে প্রথম বিনিয়োগ করে কোম্পানিটি। Jio Platforms-এ সর্বমোট ১০২০২.৫৫ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছে Silver Lake, যা প্ল্যাটফর্মটির ২.০৮% শেয়ারের সমতুল্য।
  • Jio-KKR: ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নিউইয়র্কভিত্তিক প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম KKR এখন পর্যন্ত ২০টিরও বেশি টেক কোম্পানিতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে আছে BMC Software, TikTok এর প্যারেন্ট কোম্পানি ByteDance, Gojek ইত্যাদি। Jio-এর সাথে deal এশিয়া মহাদেশে KKR এর সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট।
  • Jio-General Atlantic: অপর নিউইয়র্কভিত্তিক প্রাইভেট ইক্যুইটি ফার্ম General Atlantic-এর ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিওতে হেলথকেয়ার, ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস এবং টেকনলজি সেক্টরের বিভিন্ন কোম্পানি আছে। Uber, Airbnb, Alibaba, ANT Financial, ByteDance, Box, Snapchat এবং Facebook এর মত কোম্পানিতে ইনভেস্ট করেছে ফার্মটি। Jio ছাড়াও ভারতে আগেও ইনভেস্ট করেছে General Atlantic। বেঙ্গালুরোভিত্তিক অ্যাপার্টমেন্ট রেন্টিং স্টার্টআপ NoBroker, Education Tech বা Edtech কোম্পানি Unacademy ও Byju's, পেমেন্ট প্রসেসর কোম্পানি Billdesk এবং National Stock Exchange of India (NSE) রয়েছে General Atlantic এর পোর্টফোলিওতে।
  • Jio-Qualcomm: 5G infrastructure প্রতিষ্ঠা এবং সার্ভিস প্রদান সংক্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে Qualcomm Ventures এর কাছে শেয়ার বিক্রি করেছে Jio। এতে করে Jio 5G Technology rollout করতে Qualcomm Inc. এর পূর্ণ সাপোর্ট পাবে।
  • Jio-Intel: 5G technology rollout এর ক্ষেত্রে Intel থেকেও সাপোর্ট পাবে Jio। এছাড়াও Jio এর  বিভিন্ন প্রোডাক্ট ও সার্ভিসে Artificial Intelligence (AI), Internet of Things (IoT) - এর প্রয়োগের ক্ষেত্রেও Intel কাজ করবে। ভবিষ্যতে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট বিক্রির পরিকল্পনাও আছে Jioর; যার জন্য Intel এর সাথে যৌথভাবে কাজ করবে কোম্পানিটি।
  • Jio-Vista: Vista এর ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম, প্রোডাক্ট ও সার্ভিসে AI, IoT, Blockchain, Augmented Reality (AR)/Virtual Reality (VR)-সহ বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের সুযোগ পাবে Jio।
Behind the Mania
কেন মাত্র ৩ মাসের মধ্যে এতগুলো বড় বিনিয়োগ হল? Jio-ই বা কেন নিজেদের প্ল্যাটফর্মের প্রায় এক তৃতীয়াংশ শেয়ার বিক্রি করে দিলো? চলুন পিছনের কারণগুলি দেখা যাক - 

১) বেশ কিছু কারণে ইনভেস্টরদের বিশেষ করে প্রাইভেট ইক্যুইটি ইনভেস্টরদের White list-এ আগে থেকেই ছিল Jio; আর সেগুলো হল - ১৩০ কোটি জনসংখ্যার বাজারে Jio-র আধিপত্য, লোনমুক্ত পোর্টফোলিও এবং রেগুলেটরি দিক থেকে নিরাপদ অবস্থান। সেই সাথে গত বছর Jio Platforms এর অপারেশন শুরু করা ছিল Jio-র মাস্টারস্ট্রোকগুলোর মধ্যে একটি। এছাড়াও করোনাভাইরাসের কারণে অনলাইন ও টেকনোলজি-ভিত্তিক ব্যবসাগুলোতে দ্রুত কাস্টমার বাড়াতে সক্ষম হয়েছে Jio। এসব কারণে Jio বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানির বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।

২) Jio এখন আর শুধুমাত্র একটি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর না, প্রায় সব ধরণের ডিজিটাল বিজনেসে প্রবেশ করা একটি পরিপূর্ণ টেক কোম্পানি। আর এইসব কারণে Jio Platforms ইনভেস্টরদের কাছ থেকে higher valuation পেয়েছে। প্রাইভেট ইক্যুইটি কোম্পানিগুলো প্ল্যাটফর্মটিকে তার ইক্যুইটির জন্য প্রায় ৪.৯ ট্রিলিয়ন রূপি ভ্যালুয়েশন দিচ্ছে, Facebook ও Google দিচ্ছে ৪.৪ ট্রিলিয়ন রূপি।

৩) টেলিকম ব্যবসাসহ আরো অন্যান্য ব্যবসাসমূহ খুব অল্প সময়ের মধ্যে শুরু করার দরুন রিলায়েন্সের লোনবুক দিনদিন বড় হয়েছে। ডিজিটাল বিজনেসের জন্য লোনবিহীন আলাদা Entity প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে বড় রকমের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং তা দিয়ে রিলায়েন্সের লোনবুক ছোট করাই ছিলো Jio Platforms বানানোর উদ্দেশ্য।


সাবসিডিয়ারি হওয়ার কারণে Reliance Jio-থেকে ১ লাখ কোটি রুপির লোন রিলায়েন্সের ঘাড়ে আসে, কিন্তু সেই সাথে সমপরিমাণ ক্যাশও আসে রিলায়েন্সের কাছে। এই ক্যাশের উৎস কি? এর আগে Jio Platforms, Reliance Jio এর ইস্যু করা Preferred Shares সাবস্ক্রাইব করে; আর তা থেকে প্রাপ্ত ক্যাশই প্যারেন্ট কোম্পানিতে ট্রান্সফার করে Jio। এখন প্রশ্ন হল এই শেয়ার সাবস্ক্রাইব করার জন্য টাকা কোত্থেকে পেল Jio Platforms। এই টাকা পেয়েছে প্যারেন্ট কোম্পানি রিলায়েন্সের কাছ থেকেই। কি, মাথা ঘুরছে?
গত বছরের শুরুর দিকে Jio Platforms-ও Reliance Jio-র মত একই পদ্ধতিতে Preferred Shares ইস্যু করে এবং সেগুলো সাবস্ক্রাইব করে রিলায়েন্স। ঘুরে ফিরে কি দাঁড়াচ্ছে? রিলায়েন্স তার নিজের ক্যাশ ব্যবহার করেছে Jio Platforms এ ফাইনান্সিংয়ের জন্য; সেই ক্যাশ Jio Platforms ব্যবহার করেছে টেলিকম সাবসিডিয়ারি Reliance Jio তে ফাইনান্সিংয়ের জন্য; এই অর্থ আল্টিমেটলি Jio, প্যারেন্ট কোম্পানি রিলায়েন্সকেই ফেরত দিয়েছে। এভাবে রিলায়েন্স তার টেলিকম সাবসিডিয়ারি কাছে থেকে লোনের সাথে নিজের ক্যাশও ফেরত পেয়েছে। গত ৩ মাসে যতগুলি Deal হয়েছে, প্রতিটি ইনভেস্টমেন্ট থেকে প্রাপ্ত অর্থের কিছু অংশ Jio Platforms নিজের কাছে রাখবে, বাকিটা দিয়ে রিলায়েন্সের লোন পরিশোধ করা হবে।


৪) আমেরিকা-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ভারত-চীন এর মধ্যে সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের সূত্র ধরে ইন্ডিয়ান কোম্পানিগুলোর মধ্যে Data Sovereignty নিয়ে কনসার্ন বেশ জোরদার হচ্ছে। টেলিকম ও ডিজিটাল পেমেন্ট-সহ আরো বিভিন্ন সেক্টরের জায়ান্টদের কাছে বিপুল সংখ্যক ডাটা রয়েছে। চীন আমেরিকার মত উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন কোম্পানির কাছে যাতে ভারতীয় ডাটার অবাধ একসেস না থাকে, সেজন্য প্রোটেকশনিস্ট আইন করা নিয়েও ব্যাপক সোচ্চার সেক্টর জায়ান্টরা। আর এইসব কারণে Google, Facebook, Amazon, Microsoft এর মত US টেক জায়ান্টরা ভারতে তাদের কার্যক্রম চালাতে বিভিন্ন রেগুলেটরি বিধিনিষেধের সম্মুখীন হচ্ছে। Jio তে Facebook, Google এর ইনভেস্টমেন্টকে তাই ভারতে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের ব্যাপারে রেগুলেটরি বিধিনিষেধের ব্যাপারে কিছুটা হলেও শৈথিল্য পাওয়া এবং ভারতীয় ডাটার একসেস পাওয়ার রাস্তা ভাবলেও ভুল হবেনা।

বিশ্বজনীন না হলেও অন্তত ভারতের টেকনোলজি-ভিত্তিক কোম্পানিগুলোর কিভাবে ব্যবসা করা উচিত তা শিখাচ্ছে রিলায়েন্স। পরবর্তীতে বিশ্বের টেক কোম্পানিগুলোও হয়ত রিলায়েন্সের দেখানো পথেই হাঁটবে।

Friday, July 17, 2020

৭০ বছরের ফার্মাসিউটিক্যালস ব্যবসার পরিসমাপ্তি - GSK এখন Unilever Consumer Care

গত ২০১৮ সালের শেষ দিকে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (GlaxoSmithKline) বা জিএসকে (GSK) তাদের ৭০ বছরের পুরোনো ফার্মা ব্যবসার ইতি টানে। ICI, Pfizer, Nuvista - এর মত আরেকটি বিদেশী কোম্পানি চলে যায় বাংলাদেশ ছেড়ে। একই বছর অ্যাংলো-ডাচ কোম্পানি ইউনিলিভার ওভারসিজ (Unilever Overseas BV) জিএসকের অবশিষ্ট হেলথ ফুড এন্ড ড্রিংক্স বা এইচএফডি (HFD) বিজনেসের ৮২% শেয়ার কিনে নেয়ার কথা ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশে জিএসকের পথচলা ও পরিসমাপ্তি নিয়ে আজকের এই লেখা।

বিশ্ববিখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের গল্প ৩০০ বছরের বেশি পুরোনো। তিন শতক ও তিন মহাদেশের ইতিহাস বহন করে ঔষধ শিল্পে আজো একটি উজ্জ্বল নাম জিএসকে।গত শতকের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে মার্জার ও এক্যুইজিশনের মাধ্যমে জিএসকে আজকের রূপ নিলেও কোম্পানিটি তাদের মূলনীতি থেকে সরেনি। আর সেটি হলো নিজেদের গবেষণার উপর ভিত্তি করে গুণগত মানসম্পন্ন ঔষধ সরবরাহ করা। বিশ্বের ৪১টির বেশি দেশে জিএসকের ১৮০টিরও বেশি নিজস্ব ফ্যাক্টরি রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ১৪০টির বেশি মেডিসিন মার্কেটে জিএসকের ঔষধ বিক্রি হয়।


সময়ের হিসাবে জিএসকে 

- প্রতি সেকেন্ডে  ৩০ ডোজের বেশি ভ্যাক্সিন সরবরাহ করে জিএসকে ।

- প্রতি মিনিটে  জিএসকের ঔষধনির্ভর ১১০০টি প্রেসক্রিপশন লেখা হয়।

- প্রতি ঘন্টায়  জিএসকে নতুন প্রোডাক্ট বানাতে ৪৫০,০০০ ডলারের বেশি খরচ করে।



যেভাবে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু

১৯৪৯ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে জিএসকে। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বাইরে থেকে আমদানির মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পর কোম্পানিটি ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে নিজস্ব ঔষধ ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭৬ সালে স্টক মার্কেটে লিস্টেড হয় কোম্পানিটি। প্রধান গ্রুপ কোম্পানির এক্যুইজিশন ফলো করে ১৯৯৫ সালে গ্ল্যাক্সো থেকে গ্ল্যাক্সো ওয়েলকাম বাংলাদেশ (Glaxo Wellcome Bangladesh) এবং ২০০০ সালে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন বাংলাদেশ (GlaxoSmithKline Bangladesh) নামে কোম্পানিটি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পায়। 


বিজনেস সেগমেন্ট
মূলত দুটি বিজনেস লাইন ছিল জিএসকের - ফার্মা এবং কনজিউমার হেলথকেয়ার। শুরু থেকেই ফার্মা বিজনেসে অনেকগুলো সেগমেন্ট বা Therapeutic Area-তে ব্যবসা করেছে জিএসকে। গুণগতমান বজায় রেখে গবেষণানির্ভর ঔষধ অনেকগুলো সেগমেন্টে বিক্রি করে বেশি সংখ্যক কাস্টমার অর্জন করাই ছিলো জিএসকের লক্ষ্য। ভ্যাক্সিনসহ মোট ১৩টি Therapeutic Area তে ৫৭টির ব্র্যান্ডের মেডিসিন বিক্রি করতো জিএসকে। কনজিউমার হেলথকেয়ারে জিএসকের পোর্টফোলিওতে আছে Horlicks, Horlicks Growth Plus, Sensodyne, Boost, Maltova, Glaxose D-এর মত ব্র্যান্ড। ফার্মা বিজনেসে স্ট্রাগল করলেও কনজিউমার হেলথকেয়ার সেগমেন্টে লাভজনকভাবেই ব্যবসা করছে কোম্পানিটি। ২০১৮ সালে ফার্মা বিজনেস বন্ধ হওয়ার আগে ২০১৭ সালের শেষে এই সেগমেন্ট থেকে জিএসকে আয় করে ২১৪ কোটি টাকা যা ২০১৫ তে ছিল ২২১ কোটি টাকা। অপরদিকে কনজিউমার হেলথকেয়ার বিজনেস থেকে ২০১৭ তে আয় হয় ৪৬৫ কোটি টাকা যা ২০১৫ তে ছিল ৪৪৯ কোটি টাকা। ২০১৭ তে জিএসকের মোট প্রফিট ছিলো ৬৭ কোটি, যা ২০১৫ তে ছিল ৮৩ কোটি। কনজিউমার হেলথকেয়ারে লাভ প্রতি বছর বাড়লেও ফার্মা বিজনেসের লসের কারণে পুরো বিজনেস ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিলো।

GSK's Therapeutic Areas & Important Brands. Source: GSK Annual Reports



Source: GSK Annual Reports


যেসব কারণে ফার্মা বিজনেস বন্ধ করলো জিএসকে
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বিদেশী ফার্মা কোম্পানিগুলোর আধিক্য ছিল এবং তারা ব্যবসাও করতো একচেটিয়া। দেশীয় ফার্মা শিল্প বাড়াতে ১৯৮২ সালে প্রণিত আইনে ঔষধের কাঁচামাল এবং তৈরিকৃত ঔষধ আমদানিতে বিদেশী কোম্পানিগুলোর উপর বেশ কিছু রেস্ট্রিকশন আরোপ করা হয়। তখন থেকে এসব রেস্ট্রিকশনের মধ্যেই ব্যবসা করছিলো বিদেশী ফার্মা কোম্পানিগুলো। তবে জিএসকের ফার্মা বিজনেস বন্ধ হওয়ার মূল কারণ ছিল দেশীয় ফার্মা শিল্পের ইকোসিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরের একটি বিশেষ বৈশিষ্ঠ্য হলো এখানে গবেষণাভিত্তিক বা R&D বেইজড ঔষধ নাই বললেই চলে; অন্যভাবে বললে দেশীয় ফার্মা মার্কেটকে একটি ব্র্যান্ডেড জেনেরিক মার্কেট বলা যায়। জেনেরিক মার্কেটের বৈশিষ্ঠ্য হল এখানের অধিকাংশ ঔষধ হচ্ছে জেনেরিক অর্থাৎ আগে প্রচলিত কোন ব্র্যান্ডেড ঔষধের কপি, যেটার তৈরি করার উপাদান, প্রণালী, ব্যবহার প্রণালী, এফেক্ট, সাইড এফেক্ট, ইত্যাদি ব্র্যান্ডেড ঔষুধটির সাথে পুরোপুরি মিল থাকে। ব্রান্ডেড ঔষুধটির (যেটা থেকে কপি করা হয়) পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তবেই জেনেরিক ঔষুধটি বাজারজাত করার অনুমতি পাওয়া যায়। বিদেশী ফার্মা কোম্পানিগুলোর মধ্যে R&D বেইজড ঔষধ তৈরির প্রবণতা বেশি থাকে; জিএসকেও তার ব্যতিক্রম ছিলোনা। R&D বেইজড ঔষুধ তৈরিতে খরচ স্বাভাবিকভাবেই জেনেরিক ঔষুধ তৈরির চেয়ে বেশি হয়। জিএসকেও তার প্যারেন্ট কোম্পানির পলিসির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে R&D বেইজড ঔষুধ উৎপাদন বন্ধ করেনি। যার ফলে ঔষধ উৎপাদনে খরচ হচ্ছিলো বেশি আবার রেভিনিউতে গ্রোথ ছিলোনা, ফলশ্রুতিতে ফার্মা সেগমেন্টে লস হচ্ছিলো। রেস্ট্রিকশনের কারণে জিএসকে তার অন্যতম প্রধান দুটি ব্র্যান্ড Evohaler ও Energix-B সহ আমদানিনির্ভর মেডিসিনগুলোতে ব্যবসা হারাচ্ছিলো। তাদের ভ্যাক্সিন সেগমেন্টে তুলনামূলক ভাল অবস্থা থাকলেও আমদানিনির্ভর ভ্যাক্সিনগুলোতেও একইভাবে ব্যবসা হারাচ্ছিলো জিএসকে।

জেনেরিক ঔষুধের আধিক্য ও সহজলভ্যতার কারণে জিএসকের R&D-নির্ভর ঔষুধের চাহিদা দিনদিন কমেছে। Respiratory ও Oncology সেগমেন্টে বেশ কিছু ইনোভেটিভ মেডিসিন আনলেও সেগুলোর চাহিদা তেমন ছিলোনা। তাছাড়া চীন ও ভারত থেকে আমদানিকৃত কম দামী ঔষুধের কাছেও কিছু ব্যবসা হারাচ্ছিলো জিএসকে। সবশেষে দেশীয় কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে না পারার ব্যাপারটা উল্লেখ না করলেই নয়। দেশীয় কোম্পানিগুলোর এগ্রেসিভ মার্কেটিং ও ডিসট্রিবিউশনের কারণে মার্কেট শেয়ার ও মার্কেট রিচ দুইটাই হারাচ্ছিলো জিএসকে। বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যালস মার্কেটে জিএসকের শেয়ার ছিল ২% এরও কম। মার্কেট রিচ বাড়াতে না পারা ও চাহিদা অনুযায়ী ঔষুধ সরবরাহ করতে না পারার কারণে কাস্টমারদের ডিমান্ডের সাথে জিএসকের প্রোডাক্ট পোর্টফোলিওর একটা বড় রকমের গ্যাপ হয়ে গিয়েছিলো। কম মার্কেট শেয়ারটিকেও ধরে রাখতে না পারা, উল্লেখযোগ্য মার্কেট রিচ অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়া, দেশীয় কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে না পারা, এবং কাঁচামাল ও তৈরি উষুধ আমদানিতে আরোপিত বিধিনিষেধ - এই সবকিছুর কারণে ২০১৩ সাল থেকে ফার্মা বিজনেসে টানা লস করে কোম্পানিটি। অবশেষে ২০১৮ সালে কোম্পানিটি ফৌজদারহাটের ৫৭ বছরের পুরোনো ফ্যাক্টরিটি বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে ফার্মা বিজনেসের ইতি টানতে বাধ্য হয়। জিএসকের ১৩টি Therapeutic Area এর মধ্যে শুধু ভ্যাকসিনগুলোর সরবরাহ অব্যাহত আছে কারণ জিএসকে, সানোফিসহ আরো বেশ কিছু কোম্পানি থেকে ইউনিসেফ ভ্যাকসিন কিনে থাকে।

বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর থেকে বিদেশী কোম্পানি চলে যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ১৯৭২ সালে ব্রিটেন-ভিত্তিক ফার্মা কোম্পানি ICI plc. বাংলাদেশে তার সাবসিডিয়ারি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে যার নাম ছিলো ICI Bangladesh। ১৯৯২ সালে ICI plc. তাদের শেয়ার ডাইভেস্ট করে লোকাল শেয়ারহোল্ডারদের কাছে এবং কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ACI Ltd.। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছিলো বিশ্ববিখ্যাত ফার্মা কোম্পানি Pfizer, যার নাম ছিল Pfizer (Bangladesh)। ICI-এর মত একই পরিণতি হয় কোম্পানিটির; নাম পরিবর্তন করে এখন Renata Ltd. নামে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি। ২০০৬ সালে নেদারল্যান্ডভিত্তিক Organon International এর সাবসিডিয়ারি, Nuvista (আগের Organon Bangladesh), একইভাবে শেয়ার ডাইভেস্ট করে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। আরেকটি বিদেশী কোম্পানি, Sanofi-ও গতবছর বাংলাদেশ ত্যাগ করার ঘোষণা দেয়।

লসমেকিং এবং অধিক খরচের ফার্মা বিজনেস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জিএসকের প্রফিটেবিলিটি ভাল হয়েছে।২০১৯ সালে কোম্পানিটির গ্রস মার্জিন ছিল ৫৫%, যা আগের বছরগুলোতে ছিলো ৩৫%-৪৫% এর মধ্যে। ফার্মা বিজনেস বন্ধ করাসহ আরো বিভিন্ন ট্রান্সিশনজনিত খরচের কারণে ২০১৮ সালে ৬৪ কোটি টাকা লস করলেও ২০১৯ সালে কোম্পানিটি প্রায় ৯৯ কোটি টাকা লাভ করে।

দৃশ্যপটে  ইউনিলিভারের আবির্ভাব
২০১৮ সালে গ্লোবাল FMCG জায়ান্ট ইউনিলিভার, জিএসকে বাংলাদেশের কনজিউমার হেলথকেয়ার সেগমেন্টের ৮২% কিনে নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে এবং ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে দুই কোম্পানি এক্যুইজিশনের ব্যাপারে সমঝোতায় আসে। যেহেতু এর আগেই জিএসকের ফার্মা বিজনেসটি বন্ধ হয়ে যায়, কার্যত জিএসকে বাংলাদেশের পুরো বিজনেসের মেজরিটি শেয়ারহোল্ডার হয় ইউনিলিভার। এই এক্যুইজিশনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে দেশের স্টক মার্কেটেও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো ইউনিলিভার। এই বছরের ২৮ তারিখ ইউনিভার (Unilever), আগের শেয়ারহোল্ডার সেটফার্স্ট (Setfirst) -এর কাছ থেকে জিএসকে বাংলাদেশের ৮২% বা প্রায় ৯৮.৭৫ লাখ শেয়ার কেনা শেষ করে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্লক মার্কেটে শেয়ারগুলো কিনতে ইউনিভারের খরচ হয় মোট ২০২০.৭৫ কোটি টাকা (শেয়ার প্রতি মূল্য ২০৪৬.৩০ টাকা)। শুধু বাংলাদেশ না, ভারত এবং এশিয়ার আরো ২০টি দেশে জিএসকের যতগুলি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি আছে সবগুলোর হেলথ ফুড এবং ড্রিংকস বিজনেস কিনে নিচ্ছে ইউনিভার, যাতে ইউনিলিভারের খরচ হবে ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই বছরের এপ্রিলেই ভারতের Hindustan Unilever Ltd. (HUL), এবং GSK Consumer Healthcare India (GSK CH India)-এর সাথে মার্জার সম্পন্ন করেছে। 

ইউনিলিভার ও জিএসকে বাংলাদেশের এই এক্যুইজিশনের পরে জিএসকের নাম হয়েছে ইউনিলিভার কনসিউমার কেয়ার (Unilever Consumer Care)। জিএসকের মূল প্রোডাক্ট পোর্টফোলিওতে কোন পরিবর্তন না আসলেও কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন আসবে। নাম পরিবর্তনের সাথে সাথে জিএসকের আগের ডিরেক্টররাও থাকছেননা; বোর্ডে বসবেন ইউনিলিভার গ্রুপ দ্বারা মনোনীত নতুন ডিরেক্টর। ইউনিলিভার কনসিউমারের অধীনে থাকবে  Horlicks, Boost, ও Glaxose D। Sensodyne ও Eno চলে যাবে জিএসকে গ্রুপের সাবসিডিয়ারি Burroughs Wellcome & Company (Bangladesh)-এর অধীনে। এই এক্যুইজিশনের ফলে ৪১০ কোটি মূল্যের হেলথ ফুড ও ড্রিংকস (HFD) মার্কেটে শক্ত অবস্থান নিতে সমর্থ হবে ইউনিলিভার।



Friday, July 3, 2020

ঋণাত্মক তেলের দাম - তেলের কম দামের সুবিধা কতটুকু নিতে পেরেছে বাংলাদেশ

এই বছরের ২০শে এপ্রিল বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম নেমে যায় শূন্যের নিচে, প্রতি ব্যারেলে -৩৭.৬৩ ডলারে। অর্থাৎ নিজেদের মজুদে থাকা প্রতি ব্যারেল তেল সরাতে বিক্রেতারা উল্টো ক্রেতাদেরকে ৩৭.৬ ডলার করে মূল্য দিয়েছেন। এত কম দামে তেল পেয়ে বড় আমদানিকারক দেশগুলোও কিছু সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেছে। পুরো বিষয়টি ব্যাখা করার চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায়।

 

বিশ্ববাজারে বিভিন্ন গ্রেডের অপরিশোধিত তেল আছে; সবচেয়ে পপুলার দুটি গ্রেড হলো - ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুড অয়েল, সংক্ষেপে ব্রেন্ট ক্রুড(Brent Crude) এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুড অয়েল, সংক্ষেপে ডব্লিউটিআই ক্রুড (WTI Crude)। উত্তর সাগরের আশেপাশের ক্ষেত্র থেকে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েল উত্তোলিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার কুশিং (Cushing) এবং তার আশেপাশের বিভিন্ন তেল ক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত হয় ডব্লিউটিআই ক্রুড। আফ্রিকা, ইউরোপ ও মিডল ইস্টের দেশগুলোর তেলের দাম নির্ধারিত হয় ব্রেন্ট ক্রুডের মাধ্যমে এবং আমেরিকার ক্ষেত্রে হয় ডব্লিউটিআই ক্রুডের মাধ্যমে। কমোডিটি মার্কেটে তেলসহ আরো বেশ কিছু কমোডিটির ফিউচারস(Futures) ট্রেডিং হয় যেখানে কোন মাসে একটি কমোডিটির দাম কত হবে তা নির্ধারিত হয় আগের কোন এক মাসে। তেলের ক্ষেত্রে এক মাস পর দাম কত হবে তা নির্ধারণ করা হয় আগের মাসে অর্থাৎ মে মাসে তেলের দাম কত হবে তা নির্ধারণ করা হয় এপ্রিলে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় যে, ডব্লিউটিআই এর ক্ষেত্রে কোন এক মাসের ফিউচারস কন্ট্রাক্ট শেষ হলে সেটেলমেন্টের সময় তেলের ডেলিভারি নিতে হয় বা ঐ কন্ট্রাক্ট অন্য কাউকে বিক্রি করে দিতে হয়। ব্রেন্ট ক্রুডের ক্ষেত্রে নগদ মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে সেটেলমেন্ট হয়; তেল ডেলিভারি নেয়ার দরকার হয়না।

Source: Visual Capitalist



Countries on the edge of North Sea.  Source: Google Map


করোনাভাইরাসের প্রভাবে এই বছরের শুরু থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি একরকম স্থবির হয়ে পড়ে, যার বড় রকমের প্রভাব পড়ে তেলের বাজারে। চাহিদা কমার সাথে সাথে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো সে হারে উৎপাদন কমায়নি। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয় যখন সৌদি আরব ও রাশিয়া তেলের বাজারে নিজেদের শেয়ার ধরে রাখতে গিয়ে "তেল যুদ্ধে"(Oil War) জড়িয়ে পড়ে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি থাকায় উৎপাদনকারী দেশগুলোর গুদামে জমতে জমতে থাকে লাখ লাখ ব্যারেল তেল। মিডল ইস্টের দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুদ করার ক্যাপাসিটি এমনিতেই কম। তার উপর চোখ রাঙাচ্ছিলো ডব্লিউটিআই কন্ট্রাক্টের তেল ডেলিভারির মাধ্যমে সেটেলমেন্টের বিষয়টি। অবশেষে যা হওয়ার তাই হয়; মে মাসের কন্ট্রাক্টের শেষ দিন মানে এপ্রিলের ২০ তারিখে সেটেলমেন্টের নিয়ম মেনে তেল ডেলিভারি নেয়ার জন্য উৎপাদকরা উল্টো ক্রেতাদেরকে মুল্য পরিশোধ করেন। ঐদিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের সর্বনিম্ন মূল্য ছিলো -৪০ ডলার (প্রতি ব্যারেল), দিনশেষে যা দাঁড়ায় -৩৭.৬৩ ডলারে। ইনভেন্টরি ক্লিয়ারেন্স ও তেল ডেলিভারির মাধ্যমে সেটেলমেন্টের ব্যাপার না থাকার কারণে ব্রেন্ট ক্রুড অবশ্য এরকম ধ্বংসযজ্ঞ দেখেনি; তার দাম ছিল প্রতি ব্যারেলে ২০ ডলারের আশেপাশে।




Source: FactSet, CNBC

 


Source: Refinitiv, The Economist

বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর লকডাউন শিথিল করার সাথে সাথে তেলের চাহিদাও বেড়েছে, দামও অবশ্যই শূন্যের নিচে পড়ে থাকেনি; বরং বেশ বেড়েছে। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও কয়েক দফায় উৎপাদন কমিয়েছে যার প্রভাব পড়েছে তেলের দামে। জুনের ৬ তারিখে সংঘটিত হওয়া ওপেকভুক্ত দেশগুলো (OPEC - Organization of Petroleum Exporting Countries) ও রাশিয়ার মধ্যকার বৈঠকে জুলাই মাস পর্যন্ত দিনপ্রতি গড় উৎপাদনের চেয়ে ১০ মিলিয়ন ব্যারেল কম তেল উৎপাদনের ব্যাপারে উৎপাদনকারী দেশগুলো সম্মত হয়। জুনের শেষে ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েলের দাম ছিলো ব্যারেল প্রতি ৩৯.৩ ডলার আর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিলো ৪১.২ ডলার। তারপরো তেলের দাম সহসা গত বছরের লেভেলে মানে ব্যারেল প্রতি ৫৫ - ৬৫ ডলারে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ। কারণ আমেরিকান তেলের খনিগুলো এখনো ফুল স্কেলে প্রোডাকশন শুরু করতে পারেনি। তারা এপ্রিল-মের ইনভেন্টরি ক্লিয়ার করতেই ব্যস্ত। আর তেলের চাহিদাও ২০২১ সালের আগে করোনা-পূর্ববর্তী লেভেলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বিভিন্ন দেশে এখনো যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল হয়নি। পুরো তেল চাহিদার ১০% যার কাছে, সেই এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির তেলের ব্যবহার করোনা-পূর্ববর্তী লেভেলে ২০২২ সালের আগে যেতে পারবে বলে মনে করছেননা ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টরা। আমেরিকান এনারজি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশনও (U.S. Energy Information Administration - EIA) অনুমান করছে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫০ ডলারে পৌঁছাতে ২০২১ সাল লেগে যেতে পারে।

 

 


                                                                                Source: Motley fool


উপরের এনালাইসিস থেকে এটুকু বলা যেতে পারে, তেলের চাহিদা, উৎপাদন ও মূল্য করোনা-পূর্ববর্তী লেভেলে যেতে বেশ সময় লেগে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা উচিত। যেসব দেশের বেশি তেল মজুদ করে রাখার ভাল ক্যাপাসিটি আছে সেসব দেশ তেলের কম দামের সুবিধা বেশি নিতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে চীন ও ভারতের কথা বলা যেতে পারে। তেলের দাম ২০ ডলারে নামার সাথে সাথে চীন দৈনিক তেলের মজুদের হার (Stockpiling rate) দ্বিগুণ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই বছর শেষে চীনের তেলের মজুদ ১ বিলিয়ন ব্যারেল ছাড়াতে পারে। অবশ্য শুধু তেলের কম দামের সুবিধা নিতে চীন মজুদ বাড়াচ্ছে তা না। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল আমদানিকারক দেশ; পুরো আমদানিকৃত তেলের ২৩% চীন একা করে। করোনাভাইরাসের কারণে আরোপকৃত লকডাউন শিথিল হওয়ার পরে চীনের অর্থনীতি দ্রুততম গতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে আছে। তেলের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে মজুদের সামঞ্জস্য রাখতেই চীন দ্রুতগতিতে স্টকপাইলিং করছে।

ভারত কি করছে? ভারত বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ তেল আমদানিকারক দেশ; নিজেদের তেল চাহিদার ৮৫% আমদানির মাধ্যমে মিটিয়ে থাকে তারা। দেশটির ৬৫ দিনের তেল মজুদ করে রাখার ক্যাপাসিটি আছে। ভারত ইতোমধ্যেই ৩২ মিলিয়ন টনের বেশি তেল মজুদ করেছে তাদের Strategic Petroleum Reserve এর আওতায়; তেলের কম দামের কারণে ৫০০০ কোটি রুপি খরচ কমানোও সম্ভব হয়েছে। শুধুমাত্র তেল আমদানির জন্য দেশটির তেল মন্ত্রণালয় ৬৭৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চিন্তা করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি ও মজুদের অভিজ্ঞতা এবং স্ট্র্যাটেজিক্যালি এগিয়ে থাকার কারণে তেলের কম দামের সুবিধা ভারত এবং চীন বেশ ভালই নিতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে।

 

এখন দেখা যাক বাংলাদেশ কি করেছে বা করছে। প্রথমেই বাংলাদেশ কিভাবে তেল আমদানি করে এই ব্যাপারে কিছু তথ্য দেয়া যাক। দেশের দৈনিক পেট্রোলিয়াম ফুয়েলের চাহিদা ১৫-২০ হাজার টনের মত। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (Bangladesh Petroleum Corporation - BPC) দুভাবে তেল কেনে - গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (G2G) চুক্তি এবং টেন্ডারের মাধ্যমে। প্রতি মাসে গড়ে ৫-৬ লাখ টন তেল আমদানি হয়; এর মধ্যে ১-১.২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল যেটা পুরোটাই কেনা হয় G2G ভিত্তিতে। পরিশোধিত তেল G2G ভিত্তিতে সাতটি দেশের আটটি কোম্পানি থেকে কেনা হয়। কোম্পানিগুলো হল - কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, পেট্রোনাস (মালয়েশিয়া), এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, পিটিটি (থাইল্যান্ড), বুমি সিয়াক পুসাকো (ইন্দোনেশিয়া), পেট্রোচাইনা, ইউনিপ্যাক এবং ভিটল (নেদারল্যান্ড)। এছাড়াও ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল আমদানির জন্য ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে; যার অংশ হিসেবে এই বছর ৬০ হাজার টন ডিজেল অয়েল আমদানি হবে। আর টেন্ডারের মাধ্যমে বছরে দুইবার তেল কেনা হয়। তেলের দাম নির্ধারিত হয় সিংগাপুর-ভিত্তিক ম্যাগাজিন, প্ল্যাটস(Platts) এ প্রকাশিত রেট অনুযায়ী। সাথে আরো কিছু চার্জ বা প্রিমিয়াম যেমন ফ্রেইট কস্ট(Freight Cost), ভ্যাট, বিভিন্ন কর, ইত্যাদি যুক্ত হয়। গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট বা টেন্ডার যেভাবেই কেনা হোকনা কেন তেলের দাম একই থাকে; প্রিমিয়াম চার্জ বিডিং এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।


Platts Magazine. Source: S&P Global Platts


প্রকাশিত হিসাব মতে, দেশে ৫০-৬০ দিনের তেল মজুদ করার ক্যাপাসিটি আছে; কিন্তু প্রকৃত হিসাব কিছু কম হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তেলের মজুদ বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে ১ লাখ টন তেল আমদানির মাধ্যমে মোটামুটি ১০ দিনের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয় এপ্রিল মাসে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বেসরকারী পাওয়ার প্রডিউসারদের কাছে মজুদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারীভাবে মজুদ বাড়ানোর জন্য পার্বতীপুর, কক্সবাজার এবং দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার (Refinery), ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে কিছু প্রকল্প নির্মাণাধীন অবস্থায় আছে।

লকডাউনের কারণে পুরো বিশ্বেই তেলের চাহিদা কমেছে; বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তেলের চাহিদা কম থাকার কারণে বর্তমান ক্যাপাসিটি অলরেডি পূর্ণ হয়ে গিয়েছে যার ফলে জ্ররুরি ভিত্তিতে বেশি পরিমাণ তেল দ্রুত মজুদ করা সম্ভব হয়নি। তেলের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে তেল মজুদ করার ক্যাপাসিটি খালি হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখার বিষয় হচ্ছে বেসরকারী পাওয়ার প্রডিউসারদের সাথে চুক্তিতে যাওয়ার মাধ্যমে কত দ্রুত কম দামী তেল মজুদ করা যাচ্ছে এবং নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো কত তাড়াতাড়ি শেষ হচ্ছে। এই সমস্ত উদ্যোগ ফলপ্রসু হতে যদি বেশি সময় চলে যায়, তাহলে তেলের কম দামের সুবিধা বড় পরিমাণে নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।


Reference:

 

1.‘ How Oil Prices Went Subzero: Explaining the COVID-19 Oil Crash

2. Negative oil price: Govt to stock extra 1.1 lakh tonnes of oil

3. পানির দরে’ জ্বালানি তেল, সুযোগ নিতে চায় বিপিসি

4. Unipec, Vitol win tender to supply Bangladesh with fuels in H1 2020

5. Bangladesh failing to cash in on cheap oil price due to lack of storage

6. India uses low crude prices to stockpile 32 million tonnes of oil

7. China has been stockpiling oil for years. Low prices give it reason to buy more

8. China’s crude reserves to reach 1.15 billion barrels in 2020

9. Crude Oil Imports by Country

10. China Doubles Rate Of Crude Stockpiling As Oil Falls Below $0

11. OPEC and Russia Are Likely to Extend Oil Production Cuts

12. The big oil turnaround: From negative prices to a bull market

13. The Future of Oil Demand Is Being Reshaped by Virus Lockdowns

14. Gulf economies to shrink 7.6pc over virus, oil slump: IMF

15. How Bangladesh can cash in on record low oil prices

16. ‘Scary,’ ‘visceral,’ ‘unprecedented’: Traders describe oil’s wild week and fall to negative prices

17. Iraq confirms commitment to reduce production in OPEC + deal